মঙ্গলবার, ১০ জুলাই, ২০১৮

ঘোর। মাদকের গল্প।

_____________________ঘোর______________________
(একটি বাস্তব গল্প ৯/৭/১৮)

দুপুরের পরে ভাতঘুমে ছিলাম।৬ তলা ভবনের নিচ তলায় থাকি অামরা। জানালা খোলা রাখি দখিনা বাতাস পেতে। বাতাসে অারামসে ঘুম এসে যায়।নতুন বাসায় বিদ্যুৎ না থাকলেও ঘরমের কারনে ঘুমের সমস্যা হয় না। দক্ষিনে বিশাল মাঠ অার অাবারিত বাতাস। এটা একটা বাড়তি সুবিধা। অার একটা অসুবিধাও অাছে সদা চোর মহাশয়ের ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়।কখন যে জানালা ফাঁকে তার হাত সর্বনাশ করে দেয় মোবাইল সহ মূল্যবান জিনিষপত্র।

চারদিকে অনেকের চেঁচামিচিতে ঘুম ভেঙে গেল অাজ। অনেকটা তাজা ঘুম। চোখে মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাহিরে চোখ রাখলাম। দেখলাম অনেক মানুষের ঝটলা। কাকে যেন ঘিরে ধরেছে সবাই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বুঝতে পারলাম চোর ধরেছে। কিসের ঘুম অার কিসের কি?দিলাম বাহিরে দৌড়। কানে বাজতেছে একটা কথা স্যারের কি চুরি করেছে, সবাই বলাবলি করছে স্যারকে ডাকেন। প্রথমে মোবাইল খুজলাম। না। মোবাইল অাছে!

একটা সুদর্শন যুবককে ঘিরে অনেকের ঝটলা। লম্বায় প্রায় ৬ ফুট হবে। ফর্সা মুখ।হাতে একটা ব্র্যাসলেট পড়া। একহাতে মোঝা লাগানো শীত প্রধান দেশের দাস্তানার মতো। পায়ে ক্যাডস। ইন করা শার্ট।অনেকদিন না মাজা  দাতগুলো ব্রাজিলের পতাকার হলুদ অংশের মতো লাগছে। হাতে একটা পুটলি। পুটলিটা ইতোমধ্যে ঘিরে ধরা জনতা খুলে পেলেছে। তাতে দুটো ওড়না অার মহিলাদের একটা অন্তর্বাস।চোর চোর চোর বলে ইতোমধ্যে অনেকে কিল, ঘুষি , থাপ্পর মেরে কাত করে ফেলেছে অানুমানিক ৩০/৩৫ বছরের যুবকটাকে। অামি নির্বাক হয়ে দেখতেছি। হঠাৎ কয়েকজন যুবক লাঠিসোটা দিয়ে মার অারাম্ভ করে দিলো অার বলতে লাগলো শালা হিরোন্সি! চেক কর শালাকে! কেন এখানে এলো? অার গালিতো চলছেই। সে এবার বলে উঠলো অামি হাসপাতালে যাচ্ছি। অামার বোনকে দেখতে। অারে অাপনেরা চিনেন না? হাজেরা অারকি অামার বোন! অাবোল তাবোল!

এ দুএকটি কথা ছাড়া ছেলেটির কেন মুখে কোন শব্দ নাই অার। অাহ! উহ!ও করছেনা। মনটা অামার ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো। প্রতিটা অাঘাতে কেমন যেন অামার মনে মোচড় দিতে লাগলো। উৎসুক জনতার ভীড় বাড়তে লাগলো। দোতলা তিন তলা থেকে উৎসুক নারীকুলের হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। মুরব্বী কয়েকজন বললো অার মাইরেন না। ছেড়ে দেন। ইতোমধ্যে তল্লাশী শেষ, তেমন কোন কিছুই পাওয়া গেলনা। তবে খোজাখুজির এক পর্যায়ে  যা পাওয়া গেল তাতে অামি তাজ্জব। এক পুটলি গাজা, কয়েকটি গাজা ভরা সিগারেট। বোঝাগেল সে মাদকাসক্ত। একটা ছেলে হাতে ইট নিয়ে মেরেছে যে তাতে মাথা থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। কিন্তু যুবকটি কান্না করছে না। তখনো তার চোখে মুখে নেশার ঘোর। সম্ভবত নেশার ঘোরে ভুলে অামার জানালার ধারে এসে পড়েছিল। হয়তো অামার মোবাইল বা এটা ওটা নিয়ে নিতো। মাদক কিনতে। ওটাই যে তার সব। অাহ মাদকরে!

খানিক বাদে ছেড়ে দেয়া হল তাকে।অাজ তার ভাগ্য ভালো। কারন এদেশে চোর ধরলে কি অবস্থা হয় সবারই তা জানা।  খোড়াতে খোড়াতে হাটছে অার কান্না করছে এবার। মনে হয় নেশার ঘোর কেটেছে এবার। কিছুদুর গিয়ে একটা ইটের উপর বসে পড়লো।

অাহহারে! কোন মায়ের সন্তান! কারো অাদরের ভাই! বা কারো স্বামী!  বা কারো পিতা! মাদক সবই কেড়ে নেয়।কোন হুশ থাকে না। এ পথে যাওয়ার রাস্তা  অাছে কিন্তু বের হবার রাস্তা নাই। অাসুন পাশের ভাই বন্ধুকে ভালোবেসে মাদক থেকে ফিরিয়ে রাখি!

নাবিলার স্বপ্নের পরাজয়

নাবিলার স্বপ্নের পরাজয়_______________________

নাবিলা। বয়স ১৮। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে ভিবোর সে।জেএসসি ও  এসএসসিতে গোলন্ডেন এ+। বেশ কয়েকটি সরকারী বেসরকারী বৃত্তিপ্রাত্ত মেধাবী তরুনী। টাকার অভাবে কোচিং করতে না পারলেও বান্ধবীদের থেকে কোচিংয়ের শীট ধার করে পড়ছে সে। অভাবের সংসার তাদের। বাবা দিনমজুর। বয়স ৫৬। মা কোন রকম মানুষের বাড়ী বাড়ী কাজ করে সংসার চালায়। নাবিলা টিউশনি করে তার পড়াশোনার খরচ বহন করে।ঘরটাও ভেঙে পড়ার উপক্রম। বর্ষায় পানিতে ভিজে জবুথুবু অবস্থা। মা বাবা এবং নাবিলার স্বপ্ন একটাই যে করেই হোক নাবিলা ডাক্তার হবে। পরিবারের দুঃখ মোচন করবে।

এভাবেই চলছিল নিত্যকার দিনলিপি। কবি বলেছিলেন -"সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের মেলা, অাশা তার একমাত্র ভেলা "। এই অাশায় বুক বেধেই চলছিল নাবিলাদের জীবন। প্রবাহমান নদীর মত। কখনো থেমে থেমে অাবার কখনোবা তীব্র স্রোতে।
অাজ নাবিলার একটা খুশির দিন। তার জন্মমদিন। সে জন্মদিন পালন করে না। কিন্তু দিনটা সে ইবাদত বান্দেগী করে কাটিয়ে দেয়। তার এ খুশির সাথে অারো একটা খুশি যোগ হয়েছে। তা হলো একটি বেসরকারী সংস্থার বৃত্তি পরীক্ষায় সে অংশগ্রহা করেছিল ৭ মাস অাগে। অাজ সে বৃত্তির টাকা পেয়েছে ১২ হাজার টাকা।

অাজ নাবিলা রান্না করবে। মা তাকে বাড়িতে রেখে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাচ্ছেন । বাবার কাশি প্রায় যক্ষার উপক্রম। রসুই ঘরে রান্না চড়িয়ে সে তার প্রিয় গানটা গুনগুনিয়ে গাইতে লাগলো...."তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়...... "।গুনগুনিয়ে সে অারো কয়েকটি গান গাইলো। রসুইঘর থেকে বড় ঘরে কি যেন নেয়ার জন্য  ঢুকলো সে। হঠাৎ করা ঘরে ঢোকার শব্দ পেল সে। পেচন ফিরে তাকাতেই দুটো হাত তাকে জোরে অাঁকড়ে ধরলো। কিছু বুঝে উঠার অাগেই সে অজ্ঞান। মুখে রুমাল বেধে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় গাড়িতে উঠিয়ে কোথায় নিয়ে গেল সে জানেনা। মুখটা তার চেনা। পাশের বাড়ির চাচাতো ভাই হাশেম। স্থানীয় সরকারদলীয় নেতা। তাকে অনেকদিন ধরে উত্যাক্ত করছিল। অাজ বাড়িতে কাওকে না পেয়ে সদলবলে উঠিয়ে নিয়ে গেছে তাকে।

অন্ধকার একটি কক্ষ। অনেক কষ্টে চোখ খুলতে চেষ্টা করলো নাবিলা। পেচনে দুই পাশে দুটো হাত দুটি খুটির সাথে বাধা। পুরো শরীরে ব্যাথা।পা দুটো  অবশ। নাড়ানো যাচ্ছে না। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেল সে। নাবিলা এখনো ঘোরে অাছে। তার উপর বয়ে যাওয়া ঝড়ের কথা সে এখনো বুঝতে পারেনি।  দরজার হালকা অালোতে সে তার শরীরে চোখ বুলিয়ে অাবারো জ্ঞান হারালো। পুরো শরীরে রক্ত লেগে তা শুকিয়ে অাছে। তার নিম্মাঙ্গে রক্ত জমাট বেধে অাছে। অার কিছু মনে নেই নাবিলার।

নাবিলা নিজেকে অাবিষ্কার করলো একটি এম্ব্যুলেন্সের মাঝে। বাবা, মা, সুমন চাচা , এলাকার মেম্বার চাচা একজন পুলিশ এবং অচেনা একজন লোক গাড়ীতে বসা। নড়ার মত কোন শক্তি নাই তার। চাচা মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বলতেছে। তাতে বোঝা গেল তার অবস্থা মারারাত্মক খারাপ পর্যায়ের। ফেনী সদর হাসপাতালে তাকে রাখেনি। চট্টগ্রামে রেফার করেছে। বেঁচে থাকার অাশা ক্ষীন। প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে। ব্লিডিং বন্ধ কররা যাচ্ছে না। ১০ জন নরপশু ধ্বংস করে দিয়েছে তার দেহ। স্তন যুগল কেটে নিয়েছে তারা। সারা শরীরে ব্লেডের দাগ। ফোনের অপর প্রান্তে এসবের বর্ননা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন চাচা। ৫জনকে অ্যারেস্ট করেছে পুলিশ। তাকে উদ্ধার করেছে গ্রামবাসীরা। হাসেমের চরের অাস্তানা থেকে। নাবিলার চোখটাও এবার বন্ধ হলো। মুখে ফেনা বেরুচ্ছে।

অচেনা লোকটি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। মনে হয় ডাক্তার হবেন। টেনশনে লোকটার ঘাম বেরুচ্ছে। চাচাকে লোকটা বললেন সরকারী হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাতে করাতে সময় ক্ষেপন হবে। অাপনারা বেসরকারী একটি হাসপাতালে ভর্তি করাই দেন।লোকটার পরিচিত কজন ডাক্তার অাছেন তাদেরকে বার বার কল দিচ্ছেন। কিন্তু কেও কল ধরছেন না। অাবশেষে তাকে একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য এম্ব্যুলেন্স থামানো হলো। কিন্তু তাকে এম্ব্যুলেন্স থেকে নামানোর অাগেই হাসপাতালের লোকজন এসে জানালো ভর্তি করানো যাবে না। কারন ডাক্তারদের এবং হাসপাতাল মালিকদের ধর্মঘট চলছে। হাতাশ হয়ে তাদের অাবার অন্য হাসপাতালের দিকে রওনা হতে হলো। কিন্তু ৫/৭টা হাসপাতেলের কেও ভর্তি নিলোনা নাবিলাকে। চট্টগ্রাম শহরের সব বেসরকারী হাসপাতালের সেবা বন্ধ।কি জামেলা করে তারা ধর্মঘট করেছে।নাবিলার স্বপ্নরা চট্টগ্রামের রাস্তায় গড়াগড়ি খেয়ে মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছে।

অবশেষে সরকারী হাসপাতালে অারো চার ঘন্টা পরে ভর্তি করানো হলো নাবিলাকে। ডাক্তার জানালো দুঘন্টা অাগে অানলেও তাকে বাঁচানো যেত। তখন নাবিলার মায়ের মনে পড়ে গেল সেই করুন অার্তনাদের কথা। এক বেসরকারী হাসপাতেলের ডাক্তারের পা জড়িয়ে কান্নার কথা। তবু ডাক্তার ভর্তি নিলো না। বার বার নাবিলার মা বলে যাচ্ছিলেন অামার মেয়েও ডাক্তার হতে চেয়েছিল।তার মায়ের মনে পড়ে গেল সেই গানটি" তুমি কি দেখেছো কভু..............জীবনের পরাজয়.............///

বিঃদ্রঃ ডাক্তারী পেশার সাথে ধর্মঘট কি মানানসই?সেবা  চাকুরী নাকি ব্যবসা?চট্টগ্রামে চলছে হাসপাতাল ধর্মঘট।

রবিবার, ৮ জুলাই, ২০১৮

গান্ধীর নোয়াখালী অাগমনের হেতু ও ছাগল চুরি!!!!

নোয়াখালীর মানুষ কত খারাপ সেটা বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে অনেকেই বলে থাকেন ‘নোয়াখালীর মানুষ গান্ধীর ছাগল চুরি করেছিলো’। সেরকমই এক অর্বাচীনের সাথে হঠাৎ দেখা হলো। খুব ভাব নিয়ে গান্ধীর ছাগল চুরির বর্ণনা দিয়ে আসছেন। আমি তাকে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, গান্ধী কেন নোয়াখালী গিয়েছিলেন?

তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। আমি তাকে বললাম নোয়াখালী মনে হয় সেসময় এখনকার কক্সবাজারের মতো ছিল। আপনার মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে হাওয়া খেতে এসেছিলেন। সেসময় নোয়াখাইল্যারা তার ছাগল চুরি করেছিলো। এমন কিছু? তিনি আর কিছু বললেন না।

যাই হোক মহাত্মা গান্ধী যাকে বলা হয় তার নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তাকে অনেকে মহান আত্মার অধিকারী মনে করেন বিধায় তাকে মহাত্মা বলে থাকেন। আমার কাছে তাকে নিচু আত্মার বলেই মনে হয় বলে আমি কখনোই তাকে মহাত্মা বলি না। সে যাই হোক তার কথা পরে হবে। কেন সে নোয়াখালী গিয়েছিল? কেনইবা তাকে ছাগল হারাতে হয়েছিল? এসব বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবে আসবে। তার আগে আমরা অন্য একটা বিষয়ে দৃষ্টিপাত করি।

নোয়াখালীতে ১৯৪৬ সালে একটি দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। ভয়াবহ দাঙ্গা। এটি ইতিহাসে নোয়াখালী রায়ট/দাঙ্গা নামে পরিচিত। ইংলিশে এই লিখে সার্চ করলে অনেক আর্টিকেল পাবেন। বাংলায়ও পেতে পারেন। উইকিতেও বেশ ভালো আর্টিকেল আছে এই নিয়ে। আপনি যদি সেগুলো পড়েন তবে আপনি এক তরফা একটি ইতিহাস পাবেন যেখানে বলা হয়েছে হিন্দুদের প্রতি ভয়াবহ নির্যাতনের কথা।

অথচ বর্তমানে নোয়াখালীর অনেকেই সেই দাঙ্গার কথা জানেন না। না জানার কারণ এই ইতিহাস নিয়ে কারো লিখার দরকার হয়নি। যেহেতু এখানে হিন্দুদের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে তাই তারাই এটা নিয়ে গবেষণা করেছে। দাঙ্গার কিছুদিন পরেই নোয়াখালী পাকিস্তানের অন্তর্গত হওয়ায় মুসলিমরা এই অঞ্চলে জয়ী হয়ে যান।

নোয়াখালীতে দাঙ্গার সূত্রপাত নোয়াখালীতে নয়। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুসলিমরা পাকিস্তান দাবী করেছে আর অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে হিন্দুরা একক ভারতের জন্য দাবী জানাচ্ছে। এই নিয়ে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা লেগেছে কলকাতায়। তারই সূত্র ধরে বিহারে শুরু হয়। কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম সমান সমান ছিলো বলে পরিস্থিতি অতটা নাজুক হয়ে পড়ে নি। তবে বিহারে মুসলিমদের অবস্থা হচ্ছিলো অত্যন্ত করুণ।

এখন যেভাবে আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল নেমেছে। সেসময় বিহার হতে নোয়াখালীতে ঢল নেমেছিলো। নোয়াখালী যদিও একেবারে মুসলিম অধ্যুষিত ছিল না, তবে নানান কারণে নোয়াখালীতে বিহারীরা এসেছিলো। এর অন্যতম কারণ নোয়াখালীর মুসলিমরা অন্য মুসলিমদের মতো অসচেতন ছিল না। তারা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন। এর কারণ এখানে ওহাবী আন্দোলন এবং হাজী শরীয়ত উল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।

বিহারীরা নোয়াখালীতে আসার আরেকটি কারণ ছিল গোলাম সরোয়ার হুসেইনী। তাঁর বাড়ি বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার শামপুরে। তিনি ছিলেন পীর পরিবারের। তারা বংশানুক্রমিকভাবে মুসলিমদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি নির্যাতিত বিহারীদের নোয়াখালীতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই লক্ষ্যে তাদের নিরাপত্তা ও আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য একটি বাহিনী তৈরি করেন। এটি মিয়ার ফৌজ নামে পরিচিত ছিল।

গোলাম সরোয়ার হুসেইনী রাজনৈতিক লোক ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির নমিনেশন নিয়ে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

যাই হোক গোলাম সরোয়ার সাহেব বিহারীদের আশ্রয় দিচ্ছিলেন পাশাপাশি বিহারে ও কলকাতায় দাঙ্গা বন্ধ করার জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টায় সাড়া দেয়নি কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ। তিনি সবার কাছে চিঠি লিখেন এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যার সমাধান চান। কেউ সমাধানে জোরালো ভূমিকা রাখেন নি। তিনি খুবই হতাশ হয়েছিলেন।

এদিকে রায়পুরের হিন্দু জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরী নোয়াখালীতে বিহারীদের এই অনুপ্রবেশ পছন্দ করছিলেন না। তিনি বিহারীসহ মুসলিমদের আগমন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরীর এই আচরণ সরোয়ার সাহেবকে ব্যাথিত করেছিলো। তিনি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু জমিদার তা মানতে নারাজ। জমিদার কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ছিলেন। সরোয়ার সাহেব তাই গান্ধীকে খবর জানালেন যাতে তিনি জমিদারকে তার নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত রাখেন। গান্ধী তার আহ্বানকে পাত্তা দিলেন না। এদিকে জমিদার নোয়াখালী থেকে সকল বহিরাগত মুসলিমকে উচ্ছেদের অভিযানে নেমেছেন।

সরোয়ার হুসেইনী কারো থেকে কোন সাহায্য না পেয়ে অবশেষে তিনি তার আস্তানা সামপুরের দিয়ারা শরীফে তার ভক্তদের ও মুসলিমদের এক সমাবেশ ডাকলেন। সেখানে তিনি মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানিয়েছেন এবং চিত্তরঞ্জনের রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আহ্বান জানান।

সকল মুসলিম তার আহবানে সাড়া দেয়। চিত্তরঞ্জনকে অবরোধ করে মুসলিমরা। সে বৃটিশ পুলিশ, আগ্নেয়াস্ত্র, তার পেয়াদা বাহিনী, হিন্দু জঙ্গী, কংগ্রেস কর্মী ও জলকামান দিয়েও সেদিন মুসলিমদের আটকাতে পারেনি। অবশেষে সে তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে এবং নিজে আত্মহত্যা করে। সরোয়ার সাহেবের এই অভিযানে তাঁকে সহায়তা করেন জনৈক মুসলিম লীগ নেতা কাশেম। সরোয়ার সাহেবের বাহিনীর নাম মিয়ার ফৌজ আর কাশেমের বাহিনীর নাম ছিল কাশেম ফৌজ।

জমিদারের পতনের পর তারা পুরো নোয়াখালীতে কয়েকটিভাগে ভাগ হয়ে হিন্দু উচ্ছেদে নেমে পড়েন। এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটনা প্রবাহ পাল্টে যায়। এবার হিন্দু শরনার্থীদের ঢল শুরু হয় নোয়াখালী থেকে। এতক্ষণে টনক নড়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর। তিনি মুসলিম নেতাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন সরোয়ার হুসেইনীকে থামানোর জন্য। কিন্তু কোন মুসলিম নেতার কথা এমনকি তার দলের প্রধান বরিশালের এ কে ফজলুল হকের কথাও শুনেন নি সরোয়ার সাহেব। কারণ এতদিন কেউ তাকে কোন সহায়তা করেনি।

অবশেষে তাকে থামানোর জন্য গান্ধী নিজেই এসেছিলেন নোয়াখালীতে। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে কংগ্রেসের উদ্যোগে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। ইতিমধ্যে সরোয়ার হুসেইনী ঘোষণা দিয়েছেন তিনি পুরো বাঙলা থেকে হিন্দুদের উচ্ছেদ করবেন। গান্ধী এসে সরোয়ার সাহেবের সাথে সেখা করতে চাইলে প্রথমে তিনি অস্বীকৃতি জানান। পরে রাজি হন।

গান্ধী যেখানেই যান সেখানেই তিনি একটি ছাগল নিয়ে যান। তিনি সেই ছাগলের দুধ পান করেন। সরোয়ার সাহেবের আস্তানায় প্রবেশ করা মাত্রই তার ছাগল হস্তগত করেন মিয়া ফৌজের লোকেরা। যখন সারোয়ার সাহেবের সাথে তার কথা হচ্ছিলো তখনই রান্না করা ছাগল উপস্থাপন করা হয় গান্ধীর সামনে। এটা ছিল সরোয়ার সাহেবের একটি থ্রেট। গান্ধী সরোয়ার সাহেবের এই আচরণেই আন্দাজ করতে সক্ষম হয় নোয়াখাইল্লারা কী জিনিস!

সরোয়ার সাহেব গান্ধীকে বলেন, আপনি ভুল স্থানে এসেছেন। দাঙ্গার সূত্রপাত এখানে নয়। আপনাকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি বিহারে ও কলকাতায়। আপনি এসেছেন নোয়াখালীতে। যেদিন কলকাতায় ও বিহারে সংঘর্ষ বন্ধ হবে সেদিন নোয়াখালী ঠান্ডা হয়ে যাবে। গান্ধী অনুরোধ করেছেন তিনি চেষ্টা চালাবেন এই সময়ের মধ্যে নোয়াখালীতে যাতে হিন্দু উচ্ছেদ বন্ধ থাকে। সরোয়ার সাহেব বলেছেন আপনি কি আমাকে এই নিশ্চয়তা দিবেন আমি বন্ধ করার সাথে সাথে বিহারে ও কলাকাতায় বন্ধ হবে?

গান্ধী নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। সরোয়ার হুসেইনী বললেন তাহলে আমাকে আপনি কোন অনুরোধ করার যোগ্যতা রাখেন না। আমি আপনার নিরাপত্তা দিতেও প্রস্তুত নই। আমি আপনাকে নোয়াখালীতে আহ্বান করিনি। সরোয়ার সাহেবের হুমকিতে গান্ধী কাজ শুরু করলেন। তিনদিনের মধ্যে পুরো ভারতে দাঙ্গা বন্ধ হলো। একথা সরোয়ার সাহেবের কাছে স্পষ্ট ছিলো গান্ধীর হাতেই সকল চাবিকাঠি। সেই সকল দাঙ্গা লাগাচ্ছে এবং মুসলিমদের হত্যা করছে।

দাঙ্গা বন্ধ হলে গান্ধী নোয়াখালীতে তার নিরাপত্তা চাইলেন এবং হিন্দুদের কল্যাণে আশ্রম করার অনুমতি চাইলেন। সরোয়ার সাহেব তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন এবং নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে হিন্দু আশ্রম করার অনুমতি দেন। সেখানের হিন্দু নেতা হেমন্তের জায়গায় আশ্রম স্থাপিত হয়।

আহমেদ আফগানী

বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮

রমজানের ধারাবাহিক অালোচনা : ১ম পর্ব, গীবত(পরচর্চা)

রমজানের ধারাবাহিক অালোচনা( ১)
অাজকের পর্ব : গীবত(পরচর্চা)
___________________________________
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ জীবনযাপন ছাড়া একাকী জীবন যাপন করা মানুষের পক্ষে সহজ নয়, তেমনটি কেউ কামনাও করে না। আবার পরিচিত সমাজের বাইরেও মানুষের পক্ষে চলা খুবই কঠিন। পৃথিবীর সমাজবদ্ধ কোনো মানুষই সামাজিক বিপর্যয় কামনা করতে পারেন না। মানুষ সব সময় সুখ ও শান্তি চায়। শান্তি মানুষের একটি আরাধ্য বিষয়। কিন্তু এই প্রত্যাশিত সুখ-শান্তি নির্ভর করে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র­ এসব পার্থক্যই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। মানুষের পারস্পরিক পরিচয়ের জন্যই এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতে এরশাদ করেছেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ﴿13﴾

হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সূরা হুজুরাত: ১৩)

সুতরাং মানব সমাজের এই পার্থক্য সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তেই। যেসব কারণে সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট হয়, সমাজ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গীবত, যা মানুষকে নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত করে। তাই তো মহান আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এই নিকৃষ্ট স্বভাব থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেন,

وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ

‘আর তোমরা কেউ কারো গীবত করো না, তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে ? একে তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে।, (সূরা হুজুরাত:১২)

সুস্থ, স্বাধীন কোনো বিবেকবান মানুষই জ্ঞান অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত মৃত মানুষ তো দূরের কথা, যে পশু জীবিত থাকলে হালাল সেই পশু মৃত হলে তার গোশতও ভক্ষণ করবে না। অথচ মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গীবতের মতো জঘন্য ফেতনায় নিমজ্জিত হয়।

♣গীবত কী?

গীবত শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দোষারোপ করা, অনুপস্থিত থাকা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি।

পরিভাষায় গীবত বলা হয় ‘তোমার কোনো ভাইয়ের পেছনে তার এমন দোষের কথা উল্লেখ করা যা সে গোপন রেখেছে অথবা যার উল্লেখ সে অপছন্দ করে।’ (মু’জামুল ওয়াসিত) গীবতের সবচেয়ে উত্তম ও বাস্তবসম্মত সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিম্মোক্ত হাদিস থেকে পেতে পারি।

সাহাবি আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গীবত কাকে বলে, তোমরা জান কি? সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ই ভালো জানেন। তিনি বললেন, তোমার কোনো ভাই (দীনি) সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গীবত। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যে দোষের কথা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে তবে তুমি অবশ্যই তার গীবত করলে আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ। (মুসলিম)
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কোনো ভাইয়ের এমন দোষের কথা বলা গীবত যা সে অপছন্দ করে।

♣গীবতের পরিণাম

গীবত ইসলামি শরিয়তে হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ ﴿1﴾

‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।’ (সূরা হুমাজাহ-১)

কেউ গীবত শুনলে তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে তা প্রতিরোধ করবে সাধ্যমতো। আর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তবে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবত শোনা নিজে গীবত করার মতোই অপরাধ। হাদিসে আছে, সাহাবি মায়মুন রাঃ বলেন, ‘একদিন স্বপ্নে দেখলাম এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, কারণ তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি। সে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবত শুনেছ এবং সম্মত রয়েছ।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরীল আঃ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানি করত। (মাজহারি)

আবু সায়িদ ও জাবের রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গীবত ব্যাভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিভাবে? তিনি বললেন, ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু গীবত যে করে তার গোনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মাফ হয় না।’
সুতরাং এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত  হল যে, গীবত একটি জঘন্য পাপাচার। এ থেকে সবাইকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে।

♣যাদের দোষ বর্ণনা করা যায়

গীবত নিঃসন্দেহে হারাম। তারপরও যাদের দোষ বর্ণনা করা যায় তা হচ্ছে­

কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী প্রতিকারের আশায় বর্ণনা করা।
সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ করা।
ফতোয়া গ্রহণ করার জন্য ঘটনার বিবরণ দেয়া ও – প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরি।
আবার যাদের স্বভাব গীবত করা তাদের সম্পর্কে অন্যদের সাবধান করার জন্য তার দোষ বর্ণনা করা জায়েজ। যেমন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা এক ব্যক্তি (মাখরামা ইবনে নওফেল) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তিনি বললেন, তাকে আসার অনুমতি দাও, সে গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট লোক। অতঃপর তিনি তার সাথে প্রশস্ত চেহারায় তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেন। অতঃপর লোকটি চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তার সম্পর্কে এমন কথা বলেছেন, অতঃপর আপনিই প্রশস্ত চেহারায় তার প্রতি তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেন। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি কখনো আমাকে অশ্লীলভাষী পেয়েছ ? নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাধিক নিকৃষ্ট সেই লোক হবে, যাকে মানুষ তার অনিষ্টের ভয়ে ত্যাগ করেছে। (বুখারি, মুসলিম)

♣গীবত করার কারণ

মানুষ সব সময় নিজেকে বড় করে দেখে, এই আমিত্বের আরেক নাম আত্মপূজা। এটা শুরু হয়ে গেলে আত্মপ্রীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন তার আত্মত্যাগের মতো মহৎ বৈশিষ্ট্য দূরিভূত হতে থাকে। ফলে এ স্থানে দানা বাঁধে হিংসা-বিদ্বেষ। আবার হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই অপরের প্রতি কুধারণার সৃষ্টি হবে, যা মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে। সুতরাং আত্মপূজা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণাই মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে।

♣বেঁচে থাকার উপায়

গীবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হচ্ছে অপরের কল্যাণ কামনা করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা করা।’

দ্বিতীয়ত, আত্মত্যাগ অর্থাৎ যেকোনো প্রয়োজনে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেয়া। যেমন আল্লাহ সূরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন,

وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ﴿9﴾

‘তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা অনটনের মধ্যে থাকে।’

তৃতীয়ত, অপরের অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া।

চতুর্থত, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বেশি বেশি করে অধ্যয়ন করা।

শেষ কথা আমাদের সব সময় আল্লাহতায়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে তিনি যেন অনুগ্রহ করে গীবতের মতো জঘন্য সামাজিক ব্যাধিতে আমাদের নিমজ্জিত হতে না দেন। এ ক্ষেত্রে জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সর্বাগ্রে। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘বান্দা যখন ভোরে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তখন শরীরের সব অঙ্গ জিহ্বার কাছে আরজ করে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহর নাফরমানি কাজে পরিচালিত করো না। কেননা, তুমি যদি ঠিক থাক, তবে আমরা সঠিক পথে থাকব। কিন্তু যদি তুমি বাঁকা পথে চলো, তবে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো। (তিরমিজি)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার জন্য তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।’ (বুখারি)
wwww.Quraneralo.com