শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০১৯

রাত্রী বিলাস( ফেনীর রাস্তায় এক রাত্রী) : জাকির রুবেল

সেদিন রাত্তিরে ফিরতে একটু দেরিই হয়েছিল। স্যার কয়েকজনের সাথে জমিয়ে আড্ডা মারতে মারতে কখন যে বরোটা বেজে গেল বুঝতেই পারিনি। এগারোটাই বাসার গেইট ক্লোজ করে দেন বাসার মালিক নবাব......। ফেনী শহরের বাসার মালিকরা এক একজন নবাব। বাসাগুলো এক একটা জেলখানা। গেইটে দারোয়ানও রাখবেন না আবার ভাড়াটেকে চাবিও দিবেননা। সকালে নামাযের জন্য উঠলে বাসার মালিকের কাছে চাবির জন্য যেতে মনে হয় বড় কোন অপরাধ করে জর্জের সামনে যাওয়া। সে জন্য ফজর নামাযটা বাসায়ই পড়া হয়।

বাসায় অাজ কেও না থাকায় আর বাসায় ঢুকতে মন চাচ্ছেনা। মাথায় অন্য একটা প্লান কাজ করছে। সারারাত বাইরে কাটালে কেমন হয়?রাতের ফেনী দেখতে কেমন তা দেখার সখ ছিল অনেক অাগ থেকেই।  আগামীকাল শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। সারাদিন ঘুমিয়ে রাতের ঘুম পুসিয়ে দেয়া যাবে। শীতের রাত, চারিদিকে ঘন কুয়াশা। ভাগ্যিস চাদরটা নিয়েই বেরিয়ে ছিলাম। কুয়াশায় ল্যাম্প পোস্টের ল্যাম্পগুলোই শুধু অালোকিত বাকি চারপাশ দেখাই যাচ্ছেনা। যেই ভাবা সেই কাজ। হঠাৎ বউয়ের ফোন - কি কর?  আমি বললাম "ঘুম পাচ্ছে রাখো জানু, সকালে কথা বলবো "। এই বলে ফোন রাখলাম। কারন এত রাতে বাইরে ঘুরার কথা বললে বউয়ের বকা খেতে হবে নিশ্চিত। হাদীসে অাছে নাকি বউয়ের সাথে ছোটখাটো মিথ্যা কথা বলা জায়েজ অাছে।

এনা কাউন্টার থেকে সোজা হাটা ধরলাম মহিপালের উদ্দেশ্যে। হাটলে দু'মিনিটের রাস্তা। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলাম আস্তে আস্তে হরটে যাবো। কিছুদুর এগুতেই একটা বুড়ো রিক্সাওয়ালা এসে বললো যাবেন?  আমি গাড় নেড়ে না বললাম। আবার হাটা ধরলাম৷ ঘড়িতে দেখি ১২ঃ৩০ মি।রাস্তা ফাঁকা। মাঝে মাঝে দুএকটা মাইক্রো সাই করে চলে যাচ্ছে রাস্তা ফাঁকা পেয়ে। মাথায় একটা গান বাজতেছে। গাইবো কি গাইবোনা এই দোটানায় অাছি। আমরা শিক্ষক মানুষ। মাঝরাতর রাস্তায় জোরে গান করা উচিত না। গানের কথা মনে হতে মনে পড়লো দাদার কথা। দাদা বলতেন রাতে ভূত পেতের ভয়ে নাকি একাকী পথিকেরা জোরে জোরে গান গাইতো।
আমি আবার ভূতে বিশ্বাস করিনা।

ভূতের কথা মনে হতেই মনে পড়লো বন্ধু সিরাজের কথা। আমাদের বন্ধুদের মাঝে একটু ভবঘুরে টাইপের ছেলে সে। ছোটবেলায় রাস্তায় চলতে তার হাতে থাকতো একটা ছোট্ট রেডিও। আমাদের তখন ভূতে ভয় থাকলেও তার সেরকম কোন ভয় ছিলনা। সে রাত বিরোতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতো। সেই আমার ভুত না বিশ্বাস করার গুরু। যাক! হাটতে হাটতে মহিপাল এসে পৌচলাম। ফ্লাইওভারটা স্বগৌরবে দাড়িয়ে অাছে আওয়ামীলীগের উন্নয়ের স্বাক্ষী হিসেবে। যদিও ফ্লাইওভার হওয়ার পরেো জ্যাম কমেনি। ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়ালাম। এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। কিছু লোক ময়লা কাথা গায়ে শুয়ে আছে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশকে দেখলাম। রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে থামিয়ে হাদিয়া নিচ্ছেন। দাড়িয়ে কিছুক্ষন তাদের সেই হাদিয়া নেয়ার দৃশ্যটা উপভোগ করছিলাম। একজন ট্রাফিক পুলিশ আমার কাছে এসে জানতে চাইলেন, নাম পরিচয়, কথায় যাবো কি কি কি ইত্যাদি ইত্যাদি। সত্য কথাটা বলে দিলাম যে চাবির জন্য বাসায় ঢুকতে পারছিনা তাই হাটতে বের হলাম। পুলিশ মসায় কিছু না বলে একগাল হাসলেন।

সামনে দক্ষিনে কিছুদূর এগোলাম। দেখলাম ফ্লাইওভারের নিচে দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে অাছে। একটা মাঝবয়সী ছেলের সাথে ঝগড়া হচ্ছে। কিসের যেন টাকা নিয়ে। আরো কাছে এগুতেই বুঝতে পারলাম ওরা দেহ প্রসারনী।রাতের মনি মনসা। ছেলটা ব্যবহার করে টাকা দিচ্ছেনা। তাই ঝগড়া। মহিলাটি যাচ্ছেতাই রকমের বাজে বাজে গালি দিচ্ছিল। পরে ছেলেটা ১০০ টাকার একটা নোট মহিলাটির গায়ে ছুড়ে দিয়ে হন হন করে পশ্চিম দিকে হাটা ধরলো। আর বিড় বিড় করে বলতে লাগলো মাগী........।মহিলাটিও বলতে লাগলো "চু.......বি অার টাকা দিবিনা হারামী বাচ্ছা, মাগীর পুত.......। আরেকবার টাকা ছাড়া আসলে.... কাটি রাখি দিমু.....।

কানে এসব অস্রাব্য গালী শুনে মনটা কেমন যেন বিশ্রী পরিবেশে ঘুরে গেল। যাক, আরো কিছুদুর সামনে এগুলাম। গত পরশু দিনে যে ভিক্ষুককে দেখলাম তার অন্ধ মেয়ের জন্য টাকা তুলছিলো আজ রাস্তায় তাকেই দেখলাম মেয়েটার উপরে উঠে অাছে। এ কোন অাজব খেলা। মাওলাই ভালো জানে। মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো 'অসভ্য'! ফ্লাইওভারের উপরে উঠবো বলে পা বাড়ালাম। ল্যাম্প পোস্টে আলো দুই সারিতে। ইউরোপ অামেরিকার মত দৃশ্য,এ যেন অঙ্কিত ছবি! দেশের একমাত্র ৬ লেন বিশিষ্ট ফ্লাইওভার এটি। সরকারের উন্নয়নের একটি বড় বিজ্ঞাপন।
ভালোই লাগছে। ঘন কুয়াশা চারদিকে। পরিবেশটা অসাধারন। ফ্লাইওভারের ঠিক মাঝ বরাবর এসে পূর্বে দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। সারাদিনের সেই ব্যাস্ত রাস্তা এখন একেবারেই ফাঁকা। চারদিকে নিশ্চুপ নিরবতা। সামনে একটা বিশাল বিলবোর্ড। কন্ডমের বিজ্ঞাপন "আসল পুরুষ " স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে অাছে। বামে অারেকটা বড় ব্যানার "মহিপাল হারবাল " এক ফাইলে যথেষ্ট।

ঘড়ির দিকে তাকালাম। সময় ১ঃ২০ মি। পেচনে পিরতেই একটি পাগলীকে দেখলাম। চমকে উঠলাম তাকে দেখে। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে অাছে। মুখে কি যেন বলছে বুঝতে পারছিনা। মনের মাঝে শিরশিরে অনুভবের হালকা ভয় খেলে গেল। জানি ভুত বলে কিছু নেই। তবুও হালকা ভয় পাচ্ছি। কি মনে করে হঠাৎ তার হাতে ২০ টাকর একটা নোট গুজে দিতেই দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেলো হাসতে হাসতে। বুকটা তখনো দড়ফড় দড়ফড় করছে। পাগলীর হলুদ দাঁতের হাসি ও ঝট চুলগুলো চোখের সামনে ভাসছে। ভালো লাগছেনা আর। নিচে নেমে এলাম ফ্লাইওবার থেকে। নিচে একটা রিক্সা দাঁড়ানো। ভাই যাবেন?
-"হ যামু।
-কই যাবেন বলেন?
-"আপনাকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরবো। সারারাত কত নিবেন?"
মাঝবয়সি লোকটার মুখে হাসির রেখা দেখা দিলো। উত্তরে বললো
-"দিয়েন ইনসাফ করি "
উঠে বসলাম রিকসায়। রিকসা ট্র্যাংক রোড়ের দিকে এগিয়ে চলছে। রিক্সাওয়ালা লোকটাকে রসিকই মনে হলো। তিনি মমতাজের একটা গান ধরলেন " ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়.... বন্ধু,যখন বউ লইয়া আমার বাড়ির সামনে দিয়া....।
আঞ্চলিকতার ভাবে মনে হলো লোকটি নোয়াখীর। জিগাইলাম -
- "চাচা বাড়ি কই "
-নোয়াখালী সোনাপুর বাজরের পূর্ব পাশে।
এখানে কই থাকেন?
-সহদেবপুর, এক ছেলে দুই মেয়ে। আর আপনেগো বউ থাকে।
ভালো ভালো। তো অারেকটা গান ধরেন না?
এবার একটু জোর গলাই গানটা ধরলেন চাচু।
"ওরে নীল ধরিয়া............. আমায় দেরে....... আমিও চাচার সাথে ঠোট নাড়তেছি।
পুরনো দিনের গানগুলো হৃদয়ে সর্বদাই নাড়া দেয়।

রিক্সা চলছে হনহনিয়ে, গান গাইতেছি গুনগুনিয়ে। হঠাৎ কানে গালিগালাজের শব্দ শুনতে পেলাম। পাশে ২০/২২ বছরের একটা যুবক ছেলে। হাতে একটা বোতল। মেদর বোতলই হবে হয়তো। মদ খাচ্ছে অার গাল দিচ্ছে। হঠাৎ যুবকটি দেখলাম একটা বৈদ্যুতিক খুটিকে জড়িযে ধরে বলতেছে " বাবা আমায় মাপ করে দাও, বাবা বাবা বাবা বলে চিৎকার করছে। ততক্ষনে অামরা পুলিশ ফাঁড়ি পেচনে পেলে সামনে এগিয়ে গেল।। মুখ থেকে ছেলেটার জন্য"উফ" শব্দটি বেরিয়ে গেলো। কত ছেলের জীবনটা ছারখার হয়ে যাচ্ছে এই মাদকের ছোবলে তার ইয়ত্তা নেই।তরুনদের ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে।

(চলবে............................

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯

ভূতুড়ে ২, ভুতের সাথে সেই রাত্রী : জাকির রুবেল

আসসালামু আলাইকুম! দরজায়  মেহমান!  দরজা খুলুন! দরজয় মেহমান!  দরজা খুলুন! কলিং বেলটা বেজেই যাচ্ছে..........

ধুর...!! এতো রাতে কে আসলো?
ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত ৩:২১। এতো রাতে বিরক্ত করার কোন মানে হয়??
--- কে...?
--- দোস্ত আমি সালমান। দরজা খোল।
সালমান,তাও এতো রাতে? আর যে কিনা হারিয়ে গিয়েছে গত ২ বছর আগে................।
আমি ভূত-প্রেত বিশ্বাস করি না। তাই ব্যাপার টা স্বাভাবিক ভেবেই দরজা খুলে দিলাম।
দরজা খোলার সাথে সাথেই কেমন যেন একটা শীতল শিহরণ বয়ে গেল আমার শরীরের মধ্য দিয়ে।ঘাড়ের পিছনের লোমগুলো সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল।
দেখলাম যে মসিউর আগাগোড়া একটা কালো কোট পড়ে এসেছে এবং হুডিটা মুখ পর্যন্ত নামিয়ে দিয়েছে।
এই গরমের মধ্যে সে হুডি দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে কেন?
পলাতক ফাঁসির আসামী নাকি,মনে মনে বলে উঠলাম আমি।
--- দোস্ত ভিতরে ডাকবি না ? আমায় বসতে দিবি না?এতো রাতে বিরক্ত করলাম নাকি তোকে?জানি যে তুই রাত জাগোস। তাই তো তোর কাছেই এলাম।
--- না না দোস্ত বিরক্ত কিসের?আয় বোস।

--- মনে মনে ভাবছিস এই গরমের মধ্যে কোট পড়ে এসেছি কেন তাই না?আসলে আমার খুব জ্বর।শরীরে খুব ঠান্ডা লাগছে তাই পড়ে এসেছি।
--- (ও আমার মনের কথা জানলো কিভাবে মনে মনে ভাবলাম) সমস্যা নেই দোস্ত।আগে বল যে তুই এই দুই বছর কই ছিলি।

--- বলবো বলেই তো এত রাতেও তোর কাছে ছুটে এসেছি।
সালমান আর আমি মুখোমুখি বসে।সালমানকে দেখতে কেমন যেন মৃত মনে হল।কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে ওর মুখাবয়ব। দৃষ্টি কেমন যেন ঘোলাটে মনে হলো। তবুও ওর কথা শোনার জন্য এতো উদগ্রিব ছিলাম যে আর বেশি কিছু ভাবি নি।

মন দিয়ে ওর গল্প শুনতে শুরু করলাম।

--- দোস্ত আমি আজ থেকে ২ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিলাম সে তো জানিস।আসলে আমি তো হারিয়ে যাই নি।আমি খুব খারাপ কাজ করেছিলাম তার মাশুল দিয়েছিলাম সেদিন।
ঘটনার দিন সন্ধ্যা বেলা আমি বাসায় ফিরছিলাম।মোটামুটি চারিদিকে ঘন অন্ধকার ছিলো।
আমাদের সেই ব্রীজের কাছাকাছি আসতেই কে যেন বলে উঠলো।

--- ভাইয়া আমাকে বাঁচান প্লিজ!আমাকে আমার বফ ছুরি মেরে ফেলে গিয়েছে।
আমি দেখলাম মেয়েটি পেট চেপে ধরে রেখেছে।বুঝলাম যে তাজা রক্ত ঝরছে সেখান থেকে।হাসপাতালে না নিলে মরেই যাবে বোঝা যায়।
একে তো এদিকে তেমন একটা যানবাহন নেই।তার উপর এই অবস্থায় সে যদি মারা যায় এবং আমায় কেউ দেখে ফেলে তাহলে ভাববে আমি মেরে ফেলেছি তাকে।

এখন দোটানায় পড়ে গেলাম- কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না?

মেয়েটির দিকে মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে তাক করলাম।যা দেখলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা।
দেখি যে,সারা গায়ে তার জুয়েলারি দিয়ে ভরা ছিল।গলায়,কানে, নাকে,হাতে সব জায়গায় স্বর্ণ দিয়ে যেন মোড়া ছিল।
আমি একটু যেন লোভে পড়ে গেলাম...।

দোস্ত তুই তো জানোস,আমি জুয়া খেলে অনেক টাকা খুঁইয়ে ফেলেছিলাম। আমার পাওনাদাররা টাকার জন্য আমায় চাপ দিচ্ছিল...

সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিলাম মেয়েটাকে খুন করবো..
খুন করে ওর স্বর্ণ নিয়ে পালাবো। কিন্তু খুন করার জন্য অস্ত্র দরকার।মেয়েটিকে একটা ঝোপের পাশে নিয়ে গেলাম।বললাম যে তুমি বসো আমি গাড়ি নিয়ে আসি........।

এই বলে সেখান থেকে সরে গিয়ে একটা বড় পাথর খুঁজতে লাগলাম।
পাথর খুঁজে এনে মেয়েটির মাথায় আঘাত করতে থাকলাম। আঘাত করতে করতে তার মাথাটা পুরো থেঁতলে দিলাম..রক্ত আর মগজে আমার হাতের তালু ভিজে গেল।এরপর তার মুখটা থেঁতলে দিলাম যাতে কেউই লাশ শনাক্ত করতে না পারে।

তারপর সেই লাশের গা থেকে সবকিছু খুলে নিলাম।খুলে নিয়ে আমার শার্ট দিয়ে স্বর্ণগুলোকে জড়িয়ে নিয়ে আমি নদীতে গোসল করে বাসায় ফিরে আসলাম।কয়েকদিন পর স্বর্ণ বিক্রি করে পাওনা শোধ করলাম।তারপর একদিন সেই ব্রিজ দিয়ে রাতের বেলা ফিরছিলাম।হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠলো,
--- ভাইয়া আমাকে বাঁচান।
আমাকে মেরে ফেলছে... (সেই অজ্ঞাত মেয়েটি)
এটা শুনে আমার মাথার পিছনের লোমগুলো সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল।

সামনে গিয়ে যা দেখলাম তার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিলাম ন।
দেখলাম সেই মেয়েটিই পড়ে রয়েছে..তার দেহ পঁচে গলে অর্ধগলিত হয়ে গিয়েছে। মুখ বলতে ছিল শুধু কালো গর্ত।সেই গর্ত থেকে আওয়াজ আসছে-
" ভাইয়া আমাকে বাঁচান"

এটা দেখে আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না।অজ্ঞান হয়ে গেলাম সেখানেই।
জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি কোন গুহায় বন্দি আছি।
সেই লাশটা তার গলিত দেহ নিয়ে আমার সামনে এসেছে।তারপর সে আমায় বলতে শুরু করলো।

তোর মত লোভী মানুষের বেঁচে থাকার কোন অধিকারই নেই।তুই সাহায্য করলে আমি আজ হয়তো বেঁচে থাকতাম।তোর জন্যই আজ আমার পরিবার শোকাহত হয়ে আছে।এই বলে সে পাথর এনে আমাকে মেরে ফেললো।আমি যেভাবে মেরেছিলাম তাকে, ঠিক সেভাবেই আমাকে পাথর দিয়ে মেরে ফেললো।
সেদিন থেকেই আমি নিখোঁজ হয়ে গেলাম..

এই বলে সালমান চুপ হয়ে গেল...............

--- আমি এসব মেনে নিতে পারছিলাম না আর। মাথাটা কেমন যেন ঘোরা শুরু করলো।
তবুও সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম,,
তাহলে কে তুমি..?

--- আমি সেই মেয়েটির আত্মা।সালমানের মধ্যে ভর করেছি...আমার বেঁচে থাকার জন্য মানুষের হৃদপিন্ড খাওয়া লাগবে।সালমানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলে তুমি।তাই তোমার কাছেই এসেছি আমি।এই বলে সে কোটের পকেট থেকে ছুরি বের করল।তারপর আমাকে খুন করে ফেললো।

ঘটনার দুদিন পর সালমানের লাশ পাওয়া গেল সেই ব্রিজের কাছেই।দু'বছর পর সালমানের লাশ পাওয়া গিয়েছিল।ক্ষতবিক্ষত মুখ ছিল লাশের এবং হৃদপিন্ড ছিল না।পুলিশ অনেক ভেবেও কেসটির কোন কুল কিনারা করতে পারে নি.........।

এবং

এখন আমার মধ্যেই ভর করেছে সেই মেয়েটির আত্মা।আমি ছুরি নিয়ে কাউকে খুন করে তার হৃদপিন্ড খাওয়ার জন্য ঘুরছি এই মধ্যরাতে।

আর আমার শেষ টার্গেট হবে তুমি...!!!

আর হয়তো আমারই ক্ষতবিক্ষত হৃদপিন্ডহীন লাশ পড়ে থাকবে সেই ব্রিজের কাছে.........................।

ভালোবাসার গলিত হৃদপিন্ড : জাকির রুবেল


স্কুল থেকে ফিরছেন নাজিম সাহেব। স্ত্রীর ভালোবাসা মোড়ানো ফোন কল পেয়ে খুশি মনে রিসিভ করলেন। স্ত্রী তার পোয়াতি।  মহা খুশিতে তাকে জানালো যে পেটের বেবিটা নাকি আজ নড়াচড়া বেশি করতেছে। কয়েকবার লাথিও মেরেছে নাকি। হালকা ব্যাথা কিন্তু তা সুখানুভূতিতে ভরা। এ যেন এক স্ববর্গীয় সুখ। গাড়ী থেকে নামলেন। তার বাসা মিজান রোড থেকে কয়েক মিনিটের হাটার পথ। প্রতিদিনকার মতো আজো হাটছেন আর মোবাইল ঘাটাঘাটি করছেন।

সামনে একটা ডাস্টবিনে হঠাত নজর গেল। কতগুলো কুকুর ঘেউ ঘেউ করে বাতাশ ভারী করে তুলছে। আরেকটু সামনে এগুলেন তিনি। দেখলেন দলা পাকানো লাল ফুটবলের মত একটা কিছু। পুরোটা কতগুলো পিপড়ের দখলে। হঠাৎ একটা কাকের ডানা ঝাপটানোর করনে পিপড়ের দল সরে গেল। বেরিয়ে এল  মানব শিশুর হাতের মত কিছু একটা। রক্ত লেগে আছে তাতে। আঙুলগুলো অনেক ছোট। মানব শিশু দেখে চারপাশে এদদিক ওদিক তাকিয়েএকটু এগিয়ে গলেন কৌতুহল ও ভয় দুটোই লাগছে। সত্যিইতো। মানুষের বাচ্ছা!  কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না নাজিম সাহেব। সাহস সঞ্চয় করে পকেটের রুমাল বের করে পিপড়েগগুলোকে তাড়ালেন।

না। বাচ্ছাটি বেচে নেই।তার হৃদপিন্ড, ফুসফুস এখন পোকার দখলে । এইতো সেদিন ক্লাশে ছাত্রছাত্রীদের হৃদপিন্ড পড়াচ্ছিলেন। কতবার আঁকার পরেও বোর্ডে সুন্দর করে সঠিক আকৃতি আঁকতে পারেননি তিনি। মহান আল্লাহ কত সুন্দর করে গড়েছেন এ মানব শরীর।   হঠাৎ কেন যাননি তার কান্না পেয়ে গেল। নিজের স্ত্রী ও অনাগত বাচ্ছার কথা মনে পড়ে গেল। আর ভাবতে পারছেন না তিনি।চোখের কোন ঝাপসা হয়ে এল।কার বাচ্ছা, কোথাকার বাচ্ছা এখানে কি করে এল, এসব ভাবনায় ডুবে গেলেন তিনি।  হঠাৎ খেয়াল করলেন প্রায় অর্ধগলিত বাচচ্ছাটির গলায় একটা চিরকুট ঝুলানো। একটি কালো সুতা দিয়ে বাধা। কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে চিরকুটটি নিলেন।

চারপাশে অনেক লোক জমা হয়ে গেল। কেওবা গলিত বাচচ্ছার মা বাবাকে গালি দিচ্ছে, কেওবা হায় হায়! করছে, কেওবা সমাজ নীতি নৈতিকতার বুলি অাওড়াচ্ছে। কেওবা কমিশনার বা পুলিশকে ফোন দিচ্ছে। সবাইকে সাইডে করে চিরকুটটি হাতে নিয়ে পড়ার জন্য বেরিয়ে এলেন বিড় ঠেলে। চারদিক থেকে আরো লোক জড়ো হচ্ছে।

চিরকুট খুলে  প্রথম লাইনটি পড়েই নাজিম সাহেব তো থ। পড়তেছেন আর কাঁদছেন....
নাজিম সাহেব কাঁপা কাঁপা হাত নিয়ে অশ্রুসজল নয়নে চিরকুটটি পড়তে লাগলেন। পায়ের গতি স্লথ হয়ে আসছে তার।
রক্তের চোপ চোপ দাগ লেগে আছে চিরকুটে। অপরিপক্ক হাতের লেখা। কোন প্রাইমারীর বাচ্ছার লেখার মত। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় লেখা চিররকুটটি বানানে ভুলে ভরা। পাঠকের সুবিধার্থে প্রমিত ভাষায় চিরকুটটি ঠিক এরকম...... "
আমি মরিয়ম। ফাজিলপুর আমার বাড়ি। গরিব বিধায় মা ফেনীতে কাকার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। বাবা মাকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছে জানিনা। গ্রামের দাদারা বলতেন
আমি নাকি অপয়া? আচ্ছা অপয়া কি?আমি নাকি আমার বাবার নিরুদ্দেশের জন্য দায়ী? আমার জন্মের দিনই বাবা মাকে ছেড়ে
কোথায় ছলে গেছেন। মেয়ে হয়েছে তাই। বাবাকে কখনো দেখিনি। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। একবার টানা ৫ দিন ঘরে কোন খাবার না থাকায় মা আমাকে কাকার সাথে শহরের কাকার
বাসায় কাজের জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে আমি শহরে।কাকা আমায় খুব আদর করেন। নিয়মিত খোজ খবর করেন। তিনি
খুব ভালো।চাচিমাও ভাল। তবে চাচার মত ভাল না। তার ছোট ছেলেটা মানে রাজু ভাইয়া খুব খারাপ। আমাকে শুধু শুধু কষ্ট দেন।ভাইয়া অনেক রাত পর্যন্ত পড়েন। তিনি কোন ভার্সিটি
নাকি কিসে পড়েন। আমি জানিনা। রাতে অামি ঘুমালে আমার রুমে এসে এসে শুধু কাতুকুতু দেন।আমার জামার ভিতরে হাত ডুকিয়ে দেন। একদিন অামাকে তিনি খুব কষ্ট দিয়েছেন। খুব
ব্যাথা পেয়েছিলাম। সারা রাত কেঁদেছিলাম। তিনি আমার সাথে নোংরামি করলেন। আমি কাকাকে বলে দেব বললে তিনি বলেছেন "আমাকে মরে ফেলবেন। কিছুদিন পররপর ভাইয়া
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমার রুমে এসে আমার সাথে নোংরামি করতেন। আমি ভয়ে আর কাওকে কিছু বলিনি। ৫/৬ মাস পরে একদিন খুব সকালে আমার প্রচন্ড পেটে ব্যাথা।
সাথে বমিও করতেছিলাম বাররবার। কাকা আফিস থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার পরিক্ষা নিররিক্ষা করে কি যেন বললেন কাকাকে। কাকা এসে আমার মাথায় হাত বুলোলেন। মুখটা তার মলিন। কিন্তু
কিছুই বললেন না। বাসায় ফেরার পর রাতে চাচি আমাকে কি কি অনেক কথা জিজ্ঞেস করে প্রচন্ড মারলেন। তিনি আগে কখনো আমায় মারতেন না এই প্রথম তিনি আমায় মারলেন। পরে
আমি ভাইয়ার কথা বলেছিলাম যে তিনি আমার সাথে রাতে মাঝে মাঝে যা কররতেন তা সব বলে দিলাম। তিনি শুধু বার বার একথা বললতে নিষেধ করতেছেন যেন রাজু ভাইয়ার বিষয়ে
কাওকে কিছু না বলি।একদিন রাতে আমাদের পাশের বাসার বুয়া আমায় বললেন যে
আমার পেটে নাকি ৬মাসের একটি বচ্ছা আছে। আমি বুঝতে পারছিনা আমার পেটে বাচ্ছা ডুকলে কিভাবে? সেজন্যইতো আমার পেটে ব্যাথা লাগে। আমার খুশি লাগছে যে কাকাদের
বাসায় আর কোন ছোট বাচ্চা নেই। তাহলে আমার একজন খেলার সাথী পাব। কি মজা কি মজা।! আমি তার নামও ঠিক করেছি।
নামম দেব তার টগর। সারাক্ষন তার সাথে খেলবো, হাসবো আরো কত কি করবো।
সেদিন কাকাদের বাসায় একজন ডাক্তার এলেন। আমাকে একটা ইনজেকশান দিয়ে ঘুমিয়ে দিলেন। সকাল হওয়ার আগেই
জেগে উঠলাম। দেখি আমার পাশে একটা দলা পাকানো ছোট বাচ্চা। আমি খুশি হলাম দেখে। কিন্তু ব্যাথায় উঠতে পারছিলাম না। পাশে ফিরে দেখি পাশে বাসার বুয়া আমার পাশে বসে কাঁদতেছেন। তিনি আমাকে বললেন এই তোমার
বাচ্ছা। মরে গেছে। মেরে ফেলা হয়েছে তাকে। আমার কাকা ও চাচি নাকি রাতে বাচ্চাটিকে বের করে মেরেছেন। বুয়া আমার সব কথাগুলো একটা কাগজে লিখে বললেন একটা সুতা
দিয়ে যেন চিরকুটটি বাবুর গলালায় বেধে দিই। তাতে নাকি কি উপকার হবে। বাচ্চাটা নাকি আবার বেচে উঠবে তাতে।ব্যাথায় আমি নড়তে পারচিনা। বুয়া আমার বাচ্চাটির গলায় ঝুলিয়ে কেন দিবেন বুঝতে পারছিনা। তবুও লিখলাম।

শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৯

ভূতুড়ে : জাকির রুবেল

ভূত : স্বপ্ন নাকি বাস্তবতা বুঝতেছিনা.......... .
পাশেই মোবাইলটা চিৎকার করেই যাচ্ছে  বিকট অাওয়াজে। এরকম রিংটোনতো অামার মোবাইলে ছিলনা।  কয়টা বাজে  জানিনা। ফ্যান চলছে। টিভি চলছে। লাইট জালানো। চোখ কছলাতে কছলাতে মোবাইলটা ধরলাম। একটা নারী কন্ঠ। কেমন অাছেন রুবেল সাহেব? অমাকে রুবেল বলেতো কেও ডাকে না? ফোন কেটে দিয়ে নাম্বারটা চেক করলাম। কি অাশ্চার্য কোন নাম্বারই নাই কল লিস্টে।
ঘড়িতে ঠিক ২:৪৫ মি।

বাথরুমের লাইটটা হঠাৎ জ্বলে উঠলো। কে ওখানে? বাসায়তো অাজ অামি ছাড়া কেও নেই। পাশের রুমের অালোতে মনে হচ্ছে কে যেন হেটে যাচ্ছে। একটা ছায়ামূর্তি। গা টা কেমন ছমছম করে উঠলো। যদিও অামি ভূতে বিশ্বাস করি না। তবুও কলিজাটা মোছড় দিয়ে উঠলো।ধীর পায়ে পাশের রুমে গেলাম। খাটের দিকে তাকিয়েতো অামার চক্ষু ছড়কগাছ। কে যেন এ গরমেও কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে অাছে। যদিও ১০/১৫ দিন অাগেই কম্বলগুলো প্যাকেট করে নিজ হাতে উপরে রাখলাম। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে কি করবো বুঝতেছিনা।

হঠাৎই কম্বলে জড়িয়ে থাকা মানুষটি জেগে উঠলো। কুৎসিৎ একটা মুখায়বব।লম্বা লম্বা দুটো দাঁত বের করে শান্তভাবে অামার দিকে তাকিয়ে অাছে। এগিয়ে অাসসছে হাত বাড়িয়ে অামার দিকে। হাতে ১২ টি অাঙ্গুল। অামি দিলাম দৌড়। দৌড়াচ্ছি অার দৌড়াচ্ছি। এই বুঝি ধরে ফেললো। পা অার চলছেনা। থেমে গেলাম। গাড়ে কারো শীতল হাতের স্পর্শ পেলাম।ভূতদের হাত নাকি শীতল হয়। ভাবছি এই বুঝি জীবন প্রদীপ নিভে এলো। পেচনে সজোরে অাঘাত করলাম। প্রচন্ড ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলাম। হাতের ছামড়া ছিড়ে গেছে। ঘুম ভেঙে গেল। দিখি হাত থেকে রক্ত ঝরছে। ঘুষিটা মনে হয় দেয়ালে লেগেছে। তাহলে কি এতক্ষন স্বপ্ন দেখছিলাম?

অাবারও মোবাইলটা ফোন বেজে উঠলো।স্বপ্নের ঘোর তখনো কাটেনি  দেখি Farjana Hosain Farjuর  ফোন। রিসিভ করতে বললো ওর ছোট অাংকেল জনাব( Rafiqul Islam)   ঢাকা থেকে ফিরছেন।অামার বাসায় বাকি রাতটুকু কাটাবেন।খুশি হলাম এটা জেনে।  রাত ৩:০০। কল রিসিভে অাবার অামার বরাবরই অালসেমি। ভাগ্যিস এতরাতে স্বপ্নটা অামায় জাগিয়ে দিল নচেৎ বড় লজ্জায় পড়ে যেতাম।

মঙ্গলবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

ছোটদের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী : টমাস অালভা এডিসন

ছোট্ট বন্ধুরা! কেমন আছো তোমরা? কি, মন খারাপ? দীর্ঘদিন তোমাদের প্রিয় পত্রিকার প্রিয় বিভাগ "বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী " দেখতে পাওনি বলে। আজ থেকে আবারো শুরু হবে নতুন উদ্যোমে। তোমরা কি থাকবে আমার সাথে? চলো তাহলে শুরু করা যাক -------------
তোমরা  হয়তো এমন একজনের নাম শুনে
থাকবো। যিনি পারিপার্শ্বিক অনেক কিছু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করতেন। একবার
তিনি মুরগির মতো ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বের করবার উদ্দেশ্যে ঘরের এক কোণে ডিম সাজিয়ে বসে পড়লেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। এই বিজ্ঞানীকে নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক পত্রিকায় ছাপা হয়, ‘মানুষের ইতিহাসে এডিসনের মাথার দাম সবচেয়ে বেশি। কারণ এমন সৃজনী শক্তি অন্য কোনো মানুষের মাঝে দেখা যায় নি।

 

অন্যতম অবদানসমূহ :

১. ভোল্ট গণনা করার যন্ত্র আবিষ্কার

২. ডুপ্লেক্স টেলিগ্রাফ পদ্ধতির আবিষ্কার

৩. বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ডাইনামো এবং জেনারেটর আবিষ্কার

৪. কিনেটোগ্রাফ’ গতিশীল ছবি তোলবার জন্য প্রথম ক্যামেরা আবিষ্কার।

টমাস আলভা এডিসনের জন্ম ১৮৪৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কানাডার মিলানে। তাঁর পিতা ছিলেন
ওলন্দাজ বংশোদ্ভুত। এ সময় তাঁর পিতার আর্থিক সচ্ছলতা ছিল। ফলে এডিসনের ছেলেবেলার দিনগুলো ছিল আনন্দদায়ক। সাত বছর বয়সে এডিসনের পিতা মিশিগানের অন্তর্গত পোর্ট হারান নামে একটা শহরে এসে নতুন করে বসবাস শুরু করলেন। এডিসন স্কুলে ভর্তি হলেন। তিনি অসম্ভব মেধার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু স্কুলের গন্ডিবাঁধা পড়াশুনা তাঁর নিকট একঘেঁয়েমি মনে হত। পড়াশুনায় কোনো মনোযোগ নেই, শিক্ষকদের অভিযোগ শুনে ক্ষুব্ধ হতেন। ফলে স্কুল ছাড়িয়ে আনলেন। এখানেই এডিসনের তিন মাসের স্কুল জীবনের সমাপ্তি ঘটল। আর কোনদিন স্কুলে যান নি এডিসন। এবার মায়ের নিকট তাঁর পড়াশুনা শুরু হল।

এডিসন ছোটবেলা থেকে পারিপার্শ্বিক
যা কিছু আছে, যা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন এগুলো নিয়ে। বেশ মজার ঘটনা। একবার তিনি মুরগির মতো ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বের করতে পারেন কিনা তা দেখবার জন্য ঘরের এক কোণে ডিম সাজিয়ে বসে পড়লেন। এর কয়েক বছর পর তিনি বাড়িতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য একটা ছোট ল্যাবরেটরি তৈরি করলেন। কিছুদিন যেতেই তিনি হাতে-কলমে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি
ও সরঞ্জাম কিনে ফেললেন। এ সময় বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তিনি স্থির করলেন
কাজ করে অর্থ সংগ্রহ করবেন।

তেরো বছরের ছেলে কাজ করবে! তাঁর
বাবা-মা দু’জনে রীতিমত অবাক। এডিসনের
জেদ চাকরি করবে। অগত্যা আর কি করা, বাবা-মা দু’জনে রাজি হলেন। এডিসন অনেক খোঁজাখুঁজির পর খবরের কাগজ ফেরি করার কাজ পেলেন। আরো বেশকিছু আয় করার জন্য তিনি খবরের কাগজের সহিত চকলেট বাদামও রেখে দিতেন। এভাবে কয়েক মাসের মধ্যে বেশকিছু অর্থ সংগ্রহ হল।

এ সময় এডিসন জানতে পেলেন একটি
ছোট ছাপাখানা যন্ত্র কম দামে বিক্রি হবে। তিনি যে সামান্য অর্থ জমিয়েছিলেন তাই দিয়ে ছাপাখানার যন্ত্রপাতি কিনে ফেললেন। এবার নিজেই একটি পত্রিকা বের করলেন। একইসঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করা, সম্পাদনা করা, ছাপানো, বিক্রি করা, সমস্ত কাজ করতেন। অল্পদিনেই তাঁর কাগজের বিক্রির সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। লাভ হল একশো ডলার। তখন তাঁর বয়স ছিল পনেরো।

একদিন এডিসন লক্ষ করলেন, একটি ছেলে রেল লাইনের উপর খেলা করছে। দূরে একটি ওয়াগন এগিয়ে আসছে। ছেলেটির সেদিকে নজর নেই। বিপদ আসন্ন বুঝতে পেরে হাতের কাগজ ফেলে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন লাইনের উপর। আর ছেলেটি কেউ নয়। স্টেশন মাস্টারের একমাত্র ছেলে। কৃতজ্ঞ স্টেশন মাস্টার যখন এডিসনকে পুরষ্কার দিতে চাইলেন, এডিসন সে সময় টেলিগ্রাফ শেখবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। স্টেশন মাস্টার রাজি হলেন মহানন্দে। আর কয়েক মাসের মধ্যেই এডিসন টেলিগ্রাফি শেখা রপ্ত করে নিলেন। এর সঙ্গে সাংকেতিক লিপি ও তার অর্থ বুঝতে সক্ষম হলেন।

অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন এডিসন। একবার স্টাফোর্ড জংশনে রাত্রিবেলায় ট্রেন ছাড়ার সিগনাল দেওয়ার কাজ পেলেন। রাত জেগে কাজ করতে হত এবং দিনের বেলায় সামান্য কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে নিজের গবেষণার
কাজ করতেন। এ সময় তিনি একটি ঘড়ি তৈরি করলেন যেটি আপনা থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে সিগনাল দিত। এর পরে বোস্টন শহরে কাজ করার সময় দেখলেন, অফিস জুড়ে ভীষণ ইঁদুরের উৎপাত। তিনি হঠাৎ করে একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করলেন যা সহজেই ইঁদুর ধ্বংস করতে সক্ষম।

 

তিনি ১৮৬৯ সালে বোস্টনে চাকরিরত অবস্থায়
একটি যন্ত্র আবিষ্কার করলেন যা দিয়ে ভোল্ট গণনা করা যায়। এই যন্ত্রের গুণাগুণ বিবেচনা
করে উদ্ভাবক হিসেবে তাঁকে পেটেন্ট দেওয়া হল। আর এই পেটেন্ট এডিসনের জীবনে
এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এরপর বোস্টন শহর ছেড়ে চলে এলেন নিউইয়র্কে। হাতে
মোটেও পয়সা নেই। খাওয়া হয় নি দু’দিন ধরে। এক টেলিগ্রাফ অপারেটরের সাথে পরিচয় ঘটল। সে এডিসনকে এক ডলার ধার দিয়ে গোল্ড ইনডিকেটর কোম্পানির ব্যাটারি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। সেখানে দু’দিন কেটে গেল। তৃতীয় দিন তিনি খেয়াল করলেন ট্রান্সমিটারটি খারাপ হয়ে গিয়েছে। ম্যানেজারের অনুমতিক্রমে তিনি অল্পক্ষণের মধ্যেই ট্রান্সমিটারটি মেরামত করে ফেললেন। এর ফলে
তিনি কারখানার ফোরম্যান হিসেবে চাকরি পেলেন। তাঁর মাইনে ছিল ৩০০ ডলার।কিছুদিনের
মধ্যেই তিনি নিজের যোগ্যতা বলে ম্যানেজার পদে উন্নীত হলেন।

এই অর্থ দিয়ে তিনি নিজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি
কিনে গবেষণার কাজে লাগাতেন। গোল্ড ইনডিকেটর কোম্পানি টেলিগ্রাফের জন্য এক ধরনের যন্ত্র তৈরি করত যার ফিতের উপর সংবাদ লেখা হত। এ সময় এডিসনের মনে হল বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে আরো উন্নত ধরনের যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব। এজন্যে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার। এ সময় চাকরিতে ইস্তফা দিলেন এডিসন। কয়েক মাস প্রচণ্ড পরিশ্রমের
পর উদ্ভাবন করলেন এক নতুন যন্ত্র। এটি আগের চেয়ে অনেক উন্নত এবং সেই সঙ্গে এর উৎপাদন ব্যয়ও কম। তিনি এ যন্ত্রটি নিয়ে গেলেন গোল্ড ইনডিকেটর কোম্পানীর মালিকের নিকট। এতে মালিক খুশি হলেন। এডিসনকে জিজ্ঞাসা করলেন, কত দামে সে যন্ত্রটি বিক্রি করবে? এডিসন " বললেন, যদি পাঁচ হাজার ডলার দাম বেশি হয়, আবার তিন হাজার ডলার খুব কম হয় তবে কোম্পানী স্থির করুক তারা কি দামে যন্ত্রটি কিনবে। কোম্পানীর মালিক এডিসনকে চল্লিশ হাজার দিয়ে বললেন, আশা করি আপনাকে আমরা সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। এডিসন তো হতবাক!

 

এই প্রচুর অর্থ বিজ্ঞানী এডিসনের জীবনে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দিল। এতদিন
তিনি অন্যের অধীনস্থ হয়ে কাজ করতেন। সেখানে তাঁর ¯^vaxbZv ছিল না। এবার
কয়েক মাসের চেষ্টায় নিউজার্সিতে তৈরি হল তাঁর কারখানা। তিনি সেখানে দিবারাত্রি কাজ
করতেন। রাত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিতেন। এ কারখানাটি ছিল প্রকৃতপক্ষে
একটি গবেষণাগার। কয়েক বছরের মধ্যেই এডিসন প্রায় একশোটির বেশি নতুন উদ্ভাবন করে তার পেটেন্ট নিলেন। এগুলি বিক্রি করে পেলেন প্রচুর অর্থ।

এডিসন এবার নিজের কারখানায় কাজ করতে করতে পুনরায় আকৃষ্ট হলেন টেলিগ্রাফির দিকে। অল্পদিনেই
তৈরি হল ডুপ্লেক্স টেলিগ্রাফ পদ্ধতি। এর সাহায্যে দুটি বার্তা একই সাথে একই তারের মধ্যে দিয়ে দুই
দিকে পাঠানো সম্ভব। এরপরে একই সময়ে একই তারের মধ্যে দিয়ে একাধিক বার্তা প্রেরণ
করতে সক্ষম হলেন। আর এই পদ্ধতির সাহায্যে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার যে শুধু অসাধারণ উন্নতি হল তাই নয়, বরং খরচও কয়েকগুণ হ্রাস পেল।

তিনি ১৮৭৬ সালে তাঁর নতুন কারখানা স্থাপন
করলেন মেনলো পার্কে। এখানে একদিকে তাঁর গবেষণাগার অন্যদিকে কারখানা। এই মেনলো
পার্কে বিজ্ঞানী এডিসনের প্রথম উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার টেলিফোন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। আলেকজান্ডার
গ্রাহামবেল আবিষ্কার করেছিলেন টেলিফোন, কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যা
দেখা গিয়েছিল। এডিসন কয়েক মাসের চেষ্টায় তৈরি করলেন কার্বন ট্রান্সমিটার। আর এর
সহায়তায় গ্রাহকদের প্রতিটি কথা স্পষ্ট এবং পরিষ্কারভাবে শোনা গেল। চতুর্দিকে
সুনাম ছড়িয়ে পড়ল এডিসনের।

এডিসন দীর্ঘদিন মানুষের শ্রবণ যন্ত্র নিয়ে
কাজ করেছিলেন। এবার তিনি স্থির করলেন ইলেকট্রিক কারেন্টকে কাজে লাগিয়ে আলো জ্বালাবেন। সে সময়
এক ধরনের বৈদ্যুতিক আলো ছিল কিন্তু তা ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। প্রথমেই
তিনি এমন একটি ধাতুর সন্ধান করেছিলেন যার মধ্যে কারেন্ট প্রবাহিত করলে উজ্জ্বল আলো
বিকিরণ করে। তিনি বিভিন্ন রকমের ধাতু নিয়ে ১৬০০ রকমের পরীক্ষা করলেন। অবশেষে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর
তৈরি করলেন কার্বন ফিলামেন্ট।

তিনি শুধু বাল্বের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা
করছিলেন। এরপর প্রয়োজন দেখা দিল সমগ্র বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে তৎপর হলেন। তিনি
তৈরি করলেন নতুন এক ধরনের ডাইনামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার জেনারেটর থেকে শুরু করে ল্যাম্প
তৈরি করা প্রভৃতি। নিউইয়র্কে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র গড়ে উঠল যার অগ্রনায়ক
ছিলেন বিজ্ঞানী এডিসন।

এবার এডিসন তাঁর বিখ্যাত মেনলো পার্ক ছেড়ে ওয়েস্ট অরেঞ্জে চলে এলেন। ১৮৪৭
সালের ঘটনা। এসময় তিনি শব্দের গতির মতো কীভাবে ছবির গতি আনা যায় তাই নিয়ে শুরু করলেন ব্যাপক
গবেষণা। মাত্র দু’বছরের মধ্যে উদ্ভাবন করলেন ‘কিনেটোগ্রাফ’ যা গতিশীল ছবি তোলবার জন্য প্রথম ক্যামেরা। ১৯২২ সালে এডিসন আবিষ্কার করলেন কিনেটোফো যা সংযুক্ত করা সিনেমার ক্যামেরার সাথে। এরই ফলে তৈরি হল সবাক চিত্র।

এই পরিশ্রমী বিজ্ঞানী অবশেষে ১৯৩১ সালের ১৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ‘মানুষের ইতিহাসে এডিসনের মাথার দাম সবচেয়ে বেশি। কারণ এমন সৃজনীশক্তি অন্য কোনো মানুষের মধ্যে দেখা যায় নি।

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

শর্শদীর মোহাম্মদ অালীর প্রাচীন মসজিদ: তিন গম্বুজ মসজিদ।

মুঘল নায়েব, মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ১৭৬২ সালে ফেনী অঞ্চলে নিয়োগপ্রপ্ত হন। তার সময়কালে তিনি এ এলাকায় অনেক স্থাপনা তৈরি করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফেনীর এ মসজিদটি। ১৭৯০ সালে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তার এ অঞ্চলের জমিদারি হারান।

অবকাঠামো

তিন গম্বুজ বিশিষ্ঠ এ মসজিদটি শর্শদী মাদ্রাসার ভেতর অবস্থিত। মসজিদের শিলালিপি অনুসারে, এর নির্মাণকাল ১৬৯০ থেকে ১৬৯১ সাল। তবে শিলালিপি থেকে আর কোন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মালীকানাধীন এ মসজিদটিতে বর্তমানে প্রাচীন দেয়ালের উপর নতুন করে রং করা হয়েছে।

মূল মসজিদের সামনে একটি লালচে রং করা প্রবেশপথ রয়েছে। প্রবেশ পথ এর ভেতরে রয়েছে সমতল খালি জায়গা এরপরই মূল মসজিদের স্থাপনাটি অবস্থিত। মূল গম্বুজের উপর কালো আকৃতির একটি লম্বা নকশাকৃত মিনারেরমত উঁচু অংশ রয়েছে। যার চারপাশে ইট বসিয়ে গোলাকৃতিতে সাজানো হয়েছে। এছাড়াও পূর্ব দিকের দেয়ালে একটি বড় প্রবেশপথ ও তার দুপাশে খিলানের মতন নকশাকরা স্থাপত্যশৈলী রয়েছে।

রবিবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৮

একটি মৃত্যু সনদ : জাকির রুবেল

_____________একটি মৃত্যু সনদ______________

একটা মৃত্যু সনদ।যেন তেন সনদ নয় একেবারে বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় মেডিকেল কলেজের দেয়া মৃত্যু সনদ। সনদটা হাতে নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছেন নিজাম সাহেব। দাঁড়িয়ে থাকা নয় ঢলে পড়ে যাবেন এমন অবস্থা। হাটতে পারছেন না। পা যেন অচল, অসাঢ়, নিষ্কৃয়। মনে হচ্ছে সামনে যেন কেয়ামতের অন্ধকার। নিকশ কালো অন্ধকার। মাথাটা ঘুরছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মৃত্য রেজিস্টার রুম থেকে কোন মতে বের হয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। অব্যবহৃত ঔষধগুলো ফেরত দিয়ে অাবারো নিউরো সার্জারী বিভাগের উদ্দেশ্য রওনা দিলেন তিনি। দীর্ঘ দশ দিনে হাসপাতালটা কেমন যেন পরিচিত হয়ে গেছে। মনে হয় অনেক দিনের পরিচয়। চেনা সব অলিগলি। বারান্দা ধরে এগিয়ে চলছেন। কানে বাজছে রোগীদের অাত্মচিৎকার। বাইরে রোগীর স্বজনদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা।

হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন একটা ছোট্ট শিশুর হাসির শব্দ পেয়ে। একজন মা খেলছেন তার শিশু বাচ্ছাটার সাথে। বার বার অাদর করছেন। চুমু খাচ্ছেন বাচ্ছাটার কপালে, মুখে। বাচ্ছাটা হেসেই শেষ। বাচ্ছাটার দিয়ে অপলক তাকিয়ে আছেন নিজাম সাহেব। হঠাৎই বাচ্চাটার মা নিজাম সাহেবকে দেখে বাচ্চাটাকে অাঁচলে ঢেকে ফেললেন। দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো নিজাম সাহেবের। যদিও এতক্ষন কোন কান্না ছিলনা মুখে। বাচ্ছাটার কথা মনে হতেই হাউমাউ করে উচ্চস্বরে বাচ্চা ছেলেদের মত কান্না করতে শুরু করলেন। মাথায় হাত দিয়ে এবার হাসপাতালের বারান্দায় বসেই পড়লেন।

কতক্ষণ সময় পার হয়ে গেল ভুলেই গেলেন নিজাম সাহেব। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সকাল দশটা বেজে গেছে। উঠে দাঁড়ালেন। অনেকটা দৌড়ে গেলেন নিউরো সার্জারি বিভাগে ক্ষত বিক্ষত পড়ে থাকা নিজের স্ত্রীকে দেখতে। টানা সার্জারীর দকল এবং এ বিভাগ ও বিভাগে টেনে নিতে নিতে সে ক্লান্ত, ভীষন ক্লান্ত। ফারাবীকে খাওয়াতে খাওয়াতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে। যে এখনো জানেনা তার কলিজার টুকরো ফারবী অার নেই। এই অাব্দুল্লাহ অাল ফারাবী নাম সিলেকশন নিয়ে যে কত রাত, কত দিন, কত বই ঘাটাঘাটি, কতবার ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে খুজে বের করেছেন নিজাম সাহেব ও তার স্ত্রী মিলি। কত রাগ ছিল তার উপর কেন নাম সিলেক্ট করতে এত দেরি? কেন নামের কোন বই অানছেনা। এই নিয়েতো একদিন কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল তার সাথে।

কত স্বপ্ন, কত অাকাঙ্খা, কত অাবেগ,কত ভালোবাসা। কত রাত যে কেটে গেছে বাচ্চাদের পোশাক ও খেলনা খুজতে খুজতে অনলাইনে। সেগুলো কালেক্ট করে স্বামীকে মেসেঞ্জারে পাঠাতো অার বলতো "কোনটা সুন্দর, দেখোতো? এটার অর্ডার দাও ওটার অর্ডার দাও। অারো কত কি?
ফুটিয়ে পানি পান ছিল তার চরম অনভ্যাস কিন্তু ফারাবীর জন্য সেটাও অভ্যাসে পরিনত করেছিল সে। মশারি টাঙানো ছিল তার কাছে পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কর্ম কিন্তু নিজের অসুখ হলেতো ফারাবীরও অসুখ হবে তাই সে এটাও অায়ত্ব করে নিয়েছিল। নিজাম সাহেবের অাজ সবচাইতে বেশি মনে পড়ছে একটা ঝগড়া কথা।

ফারবী কোথায় জন্ম নিবে এ নিয়েতো নিজাম সাহেবের সাথে তার মায়ের কত ঝগড়া হয়েছিল। মা বলে গ্রামে হবে। নিজাম সাহেব বলেন শহরে সুযোগ সুবিধা ভালো, ভালো ডাক্তারও পাওয়া যাবে কাছাকাছি। একদিনতো নিজাম সাহেবেররনমার সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও হয়ে গিয়েছিল। মা শহরের বাসায় অাসাই বন্ধ করে দিয়ে ছিলেন।
ফারাবীর খালাতো ভাই ফারাবীর জন্যতো অাগেই মার্কেটিং করে রেখেছিল। ফারাবীর খালা তার জন্য কাথা সেলাই করে রেখেছেন। ফারাবীর দাদাতো নাতী হবে বলে খুশিতে অাত্মহারা।অাগেই বলে রেখেছেন কত কেজি মিষ্টি খাওয়াবেন। বড় ছেলের বড় নাতি বলে কথা। ফারবীর মামাতো অাগেই বলে রেখেছেন ফারবীর জন্য কিছু যেন না কিনি, তিনি সবকিছু বিদেশ থেকে পাঠাবেন বাগীনার জন্য।

একে একে সব মনে পড়ে যাচ্ছে অাজ নিজাম সাহেবের। প্রথমে কাকে ফোন করে জানাবেন এমন সংবাদটা। এ সংবাদ যে কেও অাশা করেনি। ঘুর্নাক্ষরে কেওতো কল্পনাও করেনি এমনটা ঘটবে। দু একজনকে ফোন করতেই কান্নায় মোবাইল ভারী হওয়ার উপক্রম। খবর শুনে দাদা দাদীতো সাথে সাথেই বেহুশ। চারদিক থেকে কল অাসছে। কারো কলই অার রিসিভ করছেন না তিনি। সবার একই জিজ্ঞাসা?উত্তর জানা নেইই তার।

ফারাবীর অাকার সকল স্বাভাবিক বাচ্ছাদের থেকে একটু বড়ই ছিল। কেমন একটা অদ্ভুদ মায়া ছিল তার মুখে। সাধারন বাচ্ছারা অনেক দেরিতি হাসলেও সে কিন্তু ২য় দিনই সে হেসেছিল। বাবার হাতের অাঙুলটা মুষ্টি করে ধরে রেখেছিল চলে যাবার অাগের দিন। মাত্র অাট দিনের হায়াতে সে শত বছরের মায়া দিয়ে গিয়েছিল। হাসিটা ভীষন সু্ন্দর ছিল বিধায় হয়তো মহান রবের পচন্দ হয়েছিল। তাইতো তিনি জান্নাতের মেহমান করে ফারবীকে নিয়ে গেলেন।

এম্বুল্যান্সের দীর্ঘ যাত্রার সমময় মিলি প্রিয় সন্তানকে বুকে রেখে তখনো ঘুমোচ্ছে। ঘুম যেন মৃত্যু ঘুম। জাগ্রত থাকলেতো কতবার বেহুশ হতো তার ইয়ত্তা নেই। গাড়ী থেকে নেমেই নিজাম সাহেব বাড়া দেয়ার জন্য পকেটে হাত দিলেন। মানিব্যাগটা উদাও। দৌড়াদুড়ির কোন ফাঁকে যে পকেটমার তার তার কাজ করে গেছে খবর নেই। পকেটের সবকিছু নিয়ে গেলেও পড়ে রইলো মৃত্যু সনদটি। সেই সনদ যা এলোমেলো করে  সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে তাদের সকল অাশা ভরসাকে। বাড়ীতে লোকজনের প্রচুর ভীড়। কান্নার অাওয়াজ। ১২টায় জানাজা। নিজাম সাহেব মৃত্যু সনদটা হাতে নিয়ে  কপালে হাত দিয়ে ঘরের দরজার সামনে বসে গেলেন।তার স্বপ্নের ফারবীর জন্ম সনদ পাওয়ার অাগেই যে মৃত্যু সনদটা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।