বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১৮

মালয়েশিয়ার নির্বাচন ২০১৮

লিখেছেন Saqib Helal
মালয়েশিয়া নির্বাচন:

১)  কয়েকদিন আগে লিখেছিলাম যে আগাম নির্বাচন অনেক সময় শাসক দলের জন্য ব্যাকফায়ার হতে  পারে,  নিকট অতীতের কয়েকটি শকিং আগাম নির্বাচনের উদাহরণ দিয়েছিলাম যেমন ২০০৪ সালের  ভারতের নির্বাচন আর ২০১৭ সালের ব্রিটেনের নির্বাচন,  তার সাথে আরেকটি ঐতিহাসিক নির্বাচন যুক্ত হলো।  এই সবগুলো নির্বাচনের প্রাক্কালেই জনমত জরিপে শাসকদলগুলোর নিশ্চিত বিজয়ের কথা  বলা হয়েছিল-  অথচ ফলাফল হয়েছে বিপরীত, এককথায় শকিং!  মালয়েশিয়ার এই নির্বাচন বিভিন্ন পাপ আর জঞ্জালে আবদ্ধ চোখে অন্ধকার দেখা  শাসক আর শাসকদলগুলোর  অতি চালাকি সত্বেও যে শেষ রক্ষা হয় না   তার একটা  টেক্সটবুক উদাহরণ হয়ে থাকবে। 

২) মাহাথির-আনোয়ার জোটের বিজয়ের পেছনে সবচাইতে বেশি কৃতিত্ব আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী আর কন্যার।  দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে এমন পারিবারিক বিপর্যয়,   সবচাইতে সেনসিটিভ বিষয়ে আঘাত দিয়ে মানসন্মান নষ্ট করার এমন  নিকৃষ্টতম জঘন্য কুটিলতা,   জেলজুলুম সহ  নানা হয়রানি- ইত্যাদি মোকাবেলা করে একটা  স্বৈরাচারী পাহাড় এর সাথে অনবরত লড়াই করে একপ্রকার শূন্য  থেকে নিজেদের দল/জোটকে আজ ক্ষমতায় নিয়ে এসেছেন এই মা-মেয়ে জুটি।  এরকম তীক্ষ্ন মেধাবী ও সর্বোচ্চ সুশিশিক্ষিত,   অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন এবং অদম্য  পরিশ্রমী,  পরিশীলিত আচরণ ও মার্জিত রুচিবোধ ব্যবহার,  সর্বগুণে গুণাণ্বিতা মা-মেয়ে জুটি সারাবিশ্বের ইসলামিস্ট  ফ্যামিলিগুলোতে আর দুয়েকটা আছে কিনা সন্দেহ আছে।  এই বিজয়ের অর্ধেক কৃতিত্ব শুধুমাত্র তাদের দুইজনের।  মাহাথির-আনোয়ার সহ বাকি অন্যরা  সবাই মিলে অর্ধেক!   ডাঃ আজিজাহ ইসমাইল নিজেই প্রাইম মিনিস্টার হবার যোগ্য। তার ত্যাগ অং সান সুচির চাইতে কোন অংশেই কম নয় ।  আনোয়ার ইব্রাহিমের পরম ভাগ্য এমন স্ত্রী পাওয়া,  আর সবচেয়ে বড় সফলতা এমন কন্যা গড়ে তোলা।

৩) আনোয়ার ইব্রাহিম শুধু মালয়েশিয়ার নয়-  বরং সারাবিশ্বের ইসলামিস্ট তথা কনজারভেটিভ মুসলিম নেতৃত্বের মাঝে পাইওনিয়ার ফিগার।  যখন তুরস্ক বা তিউনিশিয়ার ইসলামিস্টদের ক্ষমতায় যাওয়ার কথা কল্পনা করা যেত না তখন আনোয়ার ইব্রাহিম ইসলামিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড সত্বেও অতি সুনাম আর সফলতার সাথেই দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতার কেঁন্দ্রবিন্দুতে।  মুরসি বা ইসমাইল হানিয়া বা এরদোয়ানের নাম শোনার অনেক আগেই আনোয়ার ইব্রাহিম ইসলামিস্টদের কাছে রোল মডেল।  কতটা মেধা, যোগ্যতা আর ক্যারিশমা  থাকলে  একটা  ইসলামিস্ট ব্যক্তি সেক্যুলার পরিবেশে এসেও এমন প্রভাব প্রতিপত্তির সাথে সর্বোচ্চ স্থান পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারে আর নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে!  তার পলিটিক্যাল আপিল, পার্সোনাল ক্যারিশমা,  আর  প্রফেশনাল কোয়ালিটির সাথে সাথে ইন্টেলেকচুয়াল ডেপ্থ- এক কথায় একজন অলরাউন্ডার।    এতো যোগ্যতা সত্বেও পলিটিক্সের পিচ্ছিল পথে তিনিও হোঁচট খেয়েছেন, কিছু স্ট্র্যাটেজিক  ভুল করেছেন।  এবারের সফলতায় সেসব মুছে যাবে।  তবে তা থেকে আমাদের কিছু শেখার আছে- তাই সেসব  পড়া উচিত।

মাহাথিরের পরে মালয়েশিয়ার প্রাইম মিনিস্টার হবার যোগ্যতম ব্যক্তি যে আনোয়ার ইব্রাহীম তা তো অনেক আগে থেকেই একপ্রকার সবার কাছেই  পরিষ্কার ছিল। মাহাথির নিজেও আনোয়ারকেই নিজের উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলছিলেন।  আনোয়ারের অবস্থান এতটা সুদৃঢ় ছিল যে অন্য কেউ মাহাথিরের উত্তরসূরি হবার খায়েশ কখনো প্রকাশ করেনি।   একপর্যায়ে যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটলো- তার পেছনে শুধু মাহাথিরকে দোষ দেয়াটা কোনমতেই  ঠিক হবে না।  আনোয়ার যে কিছু সিরিয়াস মিসক্যালকুলেশন করেছিলেন তা থেকে বোঝা যায় অতি মেধাবী লোক হয়েও এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ক্ষমতার অন্দরমহলের মারপ্যাঁচ এবং ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের মেন্টালিটি তিনিও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন নি।   তাই যথাসময়ের আগেই তিনি কিছু প্রিম্যাচিউর চাইল্ডিশ  কাজ করে ফেলেছিলেন।   তিনি মাহাথিরের সবচেয়ে সফলতম এবং যোগ্যতম  মন্ত্রী ছিলেন যার জন্য তাকে মাহাথিরের  ডেপুটি বানানো হলো- কিন্তু তাতে মনে হয় তিনি  রিয়েলিটি সম্পর্কে সেন্স কিছুটা হারিয়ে ফেলেছিলেন।  ডেপুটি হয়ে যে তার অবস্থান পাকা হবার বদলে বরং আরো সেনসিটিভ  হয়ে গেছে-  তা বুঝতে পারেন নি।  প্রমোশন সবসময় পজিশন  শক্ত করে না-  বরং অনেকসময় আরো নড়বড়ে করে দেয়।  এতদিন  তাকে মাহাথিরের উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল,  কিন্তু ডেপুটি হবার পরে আস্তে আস্তে তাকে 'উত্তরসূরি" থেকে "প্রতিদ্বন্দ্বী" করে ফেলা হলো!  এতে আনোয়ারের বিরোধীদের যেমন হাত ছিল তেমনি ওয়েস্টার্ন ইন্টেলিজেন্সগুলোরও হাত ছিল-  যারা কিছুতেই একজন ইসলামিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের লোককে কোনমতেই শাসক হিসেবে মেনে নেবে না।  তার কিছুদিন আগেই ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তোর পতনের পর তার প্রটেজে ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবি "কনজারভেটিভ মুসলিম" হবার কারণে বেশিদিন থাকতে পারেন নি কারণ পশ্চিমারা চায় নি- অথচ তিনি মেধা যোগ্যতায় সুহার্তোর স্থলাভিষিক্ত হবার সবচাইতে যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন।  আনোয়ার সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেন নি।  তিনি বরং পশ্চিমাদেরকে অতিমাত্রায় আস্থাভাজন মনে করলেন এবং তাদের ফাঁদে পা দিলেন।  পশ্চিমা মিডিয়ায় উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তাকে মাহাথিরের "উত্তরসূরীর" বদলে "প্রতিদ্বন্দ্বী" হিসেবে প্রচার করতে লাগলো।  আনোয়ার এসবের গভীরতা বা মারপ্যাঁচ বুঝতে পারেন নি।  এগুলো মাহাথিরের মনে কিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে- মাহাথির তো তখনো ক্ষমতা থেকে অবসরের সিদ্বান্ত নেন নি- এধরণের লোকেরা কিরকম আত্বসম্মান তথা ইগো কেন্দ্রিক হয়- তা তিনি উপলব্দি করেন নি।  তিনি এসব প্রচারণাকে  পজিটিভ মনে করে আহ্লাদিত হয়ে পড়েন এবং কিছু চরম হঠকারী  কাজ করে বসেন।  মাহাথির একবার বিদেশ সফরে গেলে আনোয়ারকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে যান- আনোয়ার ভারপ্রাপ্তের বদলে স্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর মতো আচরণ করেন, নিজে নিজেই  কিছু পলিসি গ্রহণ করে ফেলেন।  ইকোনোমিক ক্রাইসিসের সময় সরাসরি মাহাথিরের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন-  মাহাথিরের বদলে ওয়ার্ল্ড  ব্যাংক এর সাজেশনকে বেশি গুরুত্ব দেন।  আমেরিকা সফরে গেলে লাল গালিচা সংবর্ধনা গ্রহণ করেন, অথচ তার কিছুদিন আগে মাহাথির আমেরিকা সফরে গেলে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়নি!  আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকগুলো তাকে নিয়ে বেশ মাতামাতি করে, মালয়েশিয়ার নানা উন্নয়নের জন্য মাহাথিরের বদলে তাকে ক্রেডিট দেয়া শুরু করে, বিভিন্ন জায়গায় তার লেকচার ও মিডিয়ায় ইন্টারভিউর  ব্যবস্থা করে,  অথচ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া সসবসময় মাহাথিরের সমালোচনা করতো।  এগুলো সবই ছিল আনোয়ারকে নিয়ে সিআইএর "ওভারগেম" খেলা- সিআইএ জানতো এতে মাহাথিরের সাইকোলজিক্যাল প্রতিক্রিয়া কি হবে- যা আনোয়ার বুঝতে পারেন নি। মাহাথিরের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়েও তার মেন্টালিটি বুঝেন নি এবং অতীতে বিরোধী বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে মাহাথির কিরূপ আচরণ করেছিলেন- তা  মোটেই চিন্তা করেন নি। বরং মাহাথিরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রচারণা দেখে সম্ভবত নিজেকে সত্যিই  মাহাথিরের মতো জনপ্রিয় বা ক্ষমতাবান মনে করেছিলেন। তাই তিনি  বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে  সবচেয়ে বড় হঠকারিতা করেন দলের নির্বাচনে মাহাথিরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়ে-  অথচ এতদিন মাহাথির অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন।  তার এসব হঠকারী আচরণের মোক্ষম সুযোগ গ্রহণ করে তার বিরোধীরা।  তারা মাহাথিরকে বুঝাতে  সক্ষম হয় যে সুহার্তোর মতো তাকেও ক্ষমতাচ্যুত করার  ওয়েস্টার্ন ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং সেই ষড়যন্ত্রের পেছনে আনোয়ার জড়িত।   তখনকার মালয়েশিয়া এবং পার্শবর্তী ইন্দোনেশিয়ার যে পরিস্থিতি ছিল- সেই পরিস্থিতিতে যে কেউই আনোয়ারের বিরুদ্বে একইরকমের চরম পদক্ষেপ নিতেন।  তারপরেও বিষয়টা হয়তো এতটা তিক্ত বা কুৎসিত হতো না যদি মাহাথিরের নির্দেষক্রমে আনোয়ার স্বাভাবিকভাবে পদত্যাগ করতেন।  কিন্তু সেখানেও তিনি আরেক হঠকারী কাজ করে বসলেন।  সরকার প্রধান হিসেবে মাহাথির যে কাউকে মন্ত্রিসভায় নিতে পারেন,  পদত্যাগের নির্দেশও দিতে পারেন।  মাহাথির যখন আনোয়ারকে পদত্যাগ করতে বললেন তিনি তা  প্রফেশনালি না নিয়ে  বৈঠকে মাহাথিরের সাথে তর্ক শুরু করে দিলেন।  আমার মনে হয় তিনি স্বাভাবিকভাবে পদত্যাগ করলে মাহাথির তার বিরুদ্বে এমন চরম পদক্ষেপ নিতেন না, কিছুদিনের মধ্যেই  তাদের সম্পর্ক আবার রিকোভার করতো এবং মাহাথিরের অবসরের পরেই আনোয়ারই প্রধানমন্ত্রী হতেন।  এতো  কাঠগড় পোড়াতে হতো না,  প্রায় দুই দশক আনোয়ারের জীবন থেকে নষ্ট হতোনা,  মাঝখানে প্রায় দেড়যুগ দুই অপদার্থ শাসকের কবলে পড়ে  মালয়েশিয়ার এমন চরম ক্ষতি হতো না।

৪) মাহাথির-আনোয়ার সম্পর্কের ভাঙা-গড়ার মাঝে ক্ষমতার একটা বেসিক রুল সম্পর্কে সবার জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো- এক বনে রাজা একজনই থাকবেন।  যতদিন পর্যন্ত আপনি রাজা হতে পারছেন না- ততদিন পর্যন্ত রাজার যতই প্রিয়ভাজন হন না কেন,  একটু সামলে চলতে হবে।   নিকট অতীতে প্রায় একইরকম একটা ঘটনা প্রায় ঘটতে চলছিল তুরস্কে- এরদোয়ান আর দাউতুগলোর মাঝে।  ভাগ্য ভালো যে দাউতুগলো সেই ভুল করেন নি যেই ভুল আনোয়ার করেছিলেন।  পশ্চিমা মিডিয়াতে অলরেডি দাউতুগলোকে নিয়ে আরেকটা ওভারগেম শুরু করে দিয়েছিল-  তাকে এরদোয়ানের চাইতে বেশি ইন্টেলেকচুয়াল,  এমনকি এরদোয়ানের চাইতে বেশি সৎ ও জনপ্রিয় ইত্যাদি কিছু প্রচারণা শুরু  করে দিয়েছিল। তিনিও প্রথমে কিছুটা আহ্লাদিত হয়ে পড়েছিলেন- প্রধানমন্ত্রী হয়ে নানা সস্তা জনপ্রিয়তার কাজ যেমন বাজার  পরিদর্শনে গিয়ে সাধারণ মানুষকে চুমু খাওয়া সেলফি তোলা ইত্যাদি শুরু করে দিয়েছিলেন।  এরদোয়ানের পছন্দের প্রেসিডেন্ট পদ্দতির বিরুদ্বে  মত প্রকাশ করতে শুরু করেন।  এসব  যে রাজার মনে কিছুটা বিরক্তি সৃষ্টি করছে তা বোঝা গেল রাজা একসময় প্রকাশ্যেই তার অনেকদিনের কাছের বন্ধু এবং আস্থাভাজন পরামর্শদাতা  সম্পর্কে বলে ফেললেন-  "ভুলে যাবেন না আপনাকে কে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে"!   যাইহোক- বিষয়টা বেশিদূর  গড়ানোর আগেই দাউতুগলু  এমিকেবলি সরে পড়েছেন-  তিনিও রক্ষা পেয়েছেন,  তুরস্কও রক্ষা পেয়েছে। বিশ্বের নানাদেশে ইসলামিস্টরা জোটবদ্ব হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে-  তাদের নেতৃত্বপর্যায়ের লোকদের  এই জিনিসগুলো  মাথায় রাখতে হবে।  নিজেদের  পজিশন সম্পর্কে যেন অহেতুক বাগড়ম্বতা পেয়ে না বসে।  কখন কনফিডেন্স দেখাতে হবে আর কখন এমিকেবলি সরে যেতে হবে- সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। 

বাংলাদেশে ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকারকে  আওয়ামী  মিডিয়ায়  বলা শুরু করে দেয় "খালেদা-নিজামী" সরকার। অথচ দুইজনের ক্ষমতার  অংশের  হিসেবে আকাশ পাতাল পার্থক্য।  কারণ একটাই-  নিজামীকে খালেদার প্রতিদ্বন্দ্বী করে ফেলা।  নিজামী চমৎকার সুবক্তা  ছিলেন,  সংসদে তার হাসিমুখে আস্তে আস্তে বলা প্রাঞ্জল  বক্তৃতাগুলো হতো অসাধারণ স্টেটসমেন সুলভ, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার স্টাইল ছিল গতানুগতিক বাংলাদেশী মেঠো  রাজনৈতিক  ধারার।  এনিয়ে কথা শুরু হলো,  কয়েকদিন পরে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতার ঢং পরিবর্তন করে নিজামীর স্টাইলে "স্টেটসমেন" সুলভ বক্তৃতা দিচ্ছেন,  সাথে নিজামীর মন্ত্রিত্ব পরিবর্তিত হয়ে একধাপ নিচে।  এই হলো রাজা/রানীদের মেন্টালিটি।    এই মেন্টালিটি না বুঝে বেশি ওভারস্মার্ট  দেখাইতে গেলে ধরা খেতে হবে।   ক্ষমতার ধরা শক্ত ধরা,  ক্ষমতার খেলা কুৎসিত  খেলা -  অনেক ভালো মানুষ এসব  কুটিলতা  কল্পনা করতে পারে না, এসব মারপ্যাঁচ বুঝে   উঠতে পারে না,  তাই মাঝে মাঝে ধরা খায়।  কিন্তু কিছু শেয়াল এগুলো ভালো বুঝে।  বাংলাদেশের এরকম একটা ধূর্ত শেয়াল একবার বলেছিল- "খোদা ধরলে ছাড়ে,  কিন্তু হাসিনা ধরলে ছাড়ে  না"-  শেয়ালে শেয়াল চিনতে পেরেছিল!

বুধবার, ৯ মে, ২০১৮

আইনস্টাইন! কতইনা সহজ জীবন পরিচালনা করতেন তিনি!

এই মহাবিশ্বের একজন বাসিন্দা অামি।
এ বিশ্বজগত সম্পর্কে আমাদের ধারণায় যারা আমূল পরিবর্তন সাধন করেছেন, তাদের একজন আলবার্ট আইনস্টাইন। তার আপেক্ষিক তত্ত্বের জন্য তিনি বিশ্বখ্যাত। এমন মানুষদের জীবন সম্পর্কে সবার মধ্যে কৌতূহল থাকে। কৌতূহলী মানুষের জন্য আইনস্টাইনের জীবন থেকে কিছু তুলে ধরা হলো।

♣আইনস্টাইনকে প্রাচীন গণিতের ইতিহাসবিদ অটো নিউগেব্যুর বলেছেন, ‘কিংবদন্তি’। কিন্তু এই কিংবদন্তি মানুষটি তুলনামূলক দেরিতে কথা বলতে শেখেন। ফলে তার মা-বাবা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তো, একদিন রাতে খাবার টেবিলে সবাই আছেন। আইনস্টাইনও। হঠাৎ তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘এই স্যুপটা খুবই গরম।’ উহ! হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মা-বাবা। ছেলের মুখে প্রথম বুলি শুনে তাঁরা আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর আগে কেন তুমি কোনো কথা বলোনি?’ জবাবে আইনস্টাইন বললেন, ‘কারণ, এর আগে সবকিছু ঠিকঠাক ছিল!’

♣মানুষ মাত্রই কি ভুল হয়? নিজের ভুলভ্রান্তি নিয়ে কী ভাবতেন আইনস্টাইন? ১৯৩৫ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য আপনার কী কী দরকার?’ আইনস্টাইন বললেন, ‘একটা ডেস্ক, কিছু কাগজ আর একটা পেনসিল। সঙ্গে দরকার বড় একটা ডাস্টবিন, যেখানে আমার সব ভুল করা বা ভুলে ভরা কাগজগুলো ফেলব!’

♣অনেকের কাছে অঙ্কের সমার্থক শব্দ আতঙ্ক। তো, একবার ১৫ বছর বয়সী এক তরুণী আইনস্টাইনের কাছে সাহায্য চাইল। গণিতের ওপর বাড়ির কাজ বা হোম ওয়ার্ক সে সঠিকভাবে করতে পারছিল না। তরুণীর কাছে অঙ্ক এমনিতেই আতঙ্কের নাম। আইনস্টাইন ওই তরুণীকে বলেছিলেন, ‘গণিতের সমস্যা নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করো না। তোমার কাছে গণিত যতটা কঠিন, আমার কাছে গণিত তার চেয়েও কঠিন।’

♣আইনস্টাইন বিশ্বখ্যাত তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্বের জন্য। কিন্তু কে কী ভাবত তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়ে? জার্মান বা ফরাসীরা? ১৯৩০-এর দশকে সরবোনে (sorbonne) বক্তৃতা দেওয়ার সময় এ বিষয়ে বলেন, ‘যদি আমার আপেক্ষিক তত্ত্ব সত্য প্রমাণিত হয়, তবে জার্মানি আমাকে জার্মান হিসেবে দাবি করবে। আর ফ্রান্স বলবে যে আমি পুরো বিশ্বের নাগরিক। কিন্তু যদি তত্ত্বটা ভুল প্রমাণিত হয়, তবে ফ্রান্স বলবে, আমি একজন জার্মান এবং জার্মানি বলবে আমি হলাম ইহুদি।’

♣১৯২১ সালে ফিলিস্তিন ভ্রমণে বেরিয়েছেন আইনস্টাইন। সেখানে ‘যুব সংঘ’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন ২২ বছর বয়সী এক তরুণী। সমাজের নানা বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করছিলেন আইনস্টাইন। একবার আইনস্টাইন তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা, এখানে নারী-পুরুষে সম্পর্ক কেমন?’ এ প্রশ্ন শুনে ওই তরুণী লজ্জায় পড়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘দেখুন অধ্যাপক, এখানে কিন্তু একজন পুরুষের একটিই স্ত্রী।’ একটু হেসে তাঁর হাতখানা ধরে আইনস্টাইন বললেন, ‘না, না। আমার প্রশ্নটা ওভাবে নিয়ো না। আমরা পদার্থবিজ্ঞানীরা “সম্পর্ক” কথাটা দিয়ে সহজ কিছুকে বোঝাই। আমি আসলে জানতে চেয়েছি, এখানে কতজন নারী আর কতজন পুরুষ মানুষ।’

♣একবার এক অনুষ্ঠানে আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি একটু সহজ করে আপনার তত্ত্বটা আমাদের বোঝাবেন?’ আইনস্টাইন তখন এই গল্পটা শোনালেন।
আমি একবার বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছিলাম। বন্ধুটি ছিল অন্ধ। আমি বললাম, দুধ পান করতে ইচ্ছা করছে। ‘দুধ?’ বন্ধুটি বলল, ‘পান করা বুঝি, কিন্তু দুধ কী জিনিস?’ ‘একটা সাদা তরল পদার্থ।’ বললাম আমি। ‘তরল আমি বুঝি, কিন্তু সাদা জিনিসটা কী?’ ‘বকের পালকের রং।’
‘পালক আমি বুঝি, কিন্তু বক কী?’
‘ঘাড় কুঁজো বা বাঁকানো ঘাড়ের এক পাখি।’
‘ঘাড় সে তো বুঝি। কিন্তু এই কুঁজো কথাটার মানে কী?’ এরপর আর ধৈর্য থাকে, বলুন! আমি তার হাতটা ধরে এক ঝটকায় টানটান করলাম। বললাম, ‘এটা এখন একদম সোজা, তাই না। তারপর ধরো, কনুই বরাবর এটা ভেঙে দিলাম। এবার তোমার হাতটা যেমন আছে সেটাকেই কুঁজো বা বাঁকানো বলে, বুঝলে?’
‘আহ্!’ অন্ধ বন্ধু বলল, ‘এবার বুঝেছি, দুধ বলতে তুমি কী বুঝিয়েছ।’

♣একবার এক ছাত্র আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করল, ‘গত বছর পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন পড়েছিল, এবারের পরীক্ষায়ও ঠিকঠিক ওই সব প্রশ্নই পড়েছে।’ ‘ঠিক বলেছ।’ আইনস্টাইন বললেন, ‘কিন্তু এ বছরের উত্তরগুলো আগেরবারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা!’

♣স্বামী সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল আইনস্টাইনের স্ত্রীর? তাঁর স্ত্রীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব কি বুঝতে পারেন?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘না, কিন্তু আমার স্বামীকে বুঝি। আমি জানি, তাঁকে বিশ্বাস করা যায়।’

♣১৯৩১ সালে চার্লি চাপলিন আমন্ত্রণ জানালেন আইনস্টাইনকে। তখন সিটি লাইটস সিনেমার স্কিনিং চলছিল চাপলিনের। তো যখন চাপলিন ও আইনস্টাইন শহরের পথ ধরে যাচ্ছিলেন, অনেক মানুষ ভিড় জমায়। চাপলিন আইনস্টাইনকে বললেন, ‘সবাই আমাকে সহজেই বোঝে। এজন্যই আমার যত জনপ্রিয়তা। তা আপনাকে মানুষ এত পছন্দ করে কেন, বলতে পারেন?’ ‘আসলে’, আইনস্টাইন বলছেন, ‘কেউ আমাকে সহজে বুঝতেই পারে না বলে আমাকে এত বেশি পছন্দ করে!’

♣ এক সহকর্মী আইনস্টাইনের কাছে একবার তাঁর টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। তখন আইনস্টাইন একটা টেলিফোন বই খুঁজে বের করলেন এবং সে বইতে তাঁর নম্বরটা খুঁজতে লাগলেন। তখন সহকর্মীটি বললেন, ‘কী ব্যাপার, নিজের টেলিফোন নম্বরটাও মনে নেই আপনার?’ আইনস্টাইন বললেন, ‘না। তার দরকারই বা কী? যেটা আপনি বইতে পাবেন, সে তথ্যটা মুখস্থ করে মস্তিষ্ক খরচ করবেন কেন?

স্যার!  আমাকে প্রাইভেট পড়াবেন?
জিনিয়া জিজ্ঞেস করল তার প্রিয় শিক্ষক জনাব কামরুল হাসান স্যারকে। মাত্র ২ মাস হলো স্কুলে জয়েন করেছেন। ইতমধ্যেই সকল ছাত্রছাত্রীর প্রিয় শিক্ষকে পরিনত হয়েছেন। ইংরেজিটা মহা সুন্দর করে স্টুডেন্টদের গুলিয়ে মাথায় ডুকিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। সদা হাস্যোজ্বল ও মিষ্টভাষী। মাত্রই অনার্স শেষ করে প্রথম চাকুরি এই স্কুলে। মহাখালী উচ্চ বিদ্যালয়।

জিনিয়া, দশম শ্রেনীর রোল ৫। খুবই মেধাবী ভদ্র বলে সকল শিক্ষকের কাছে সুনাম আছে তার। তাই জিনিয়ার কথায় রাজি হলেন প্রাইভেট পড়াতে। বাসায় গিয়ে পড়াতে হবে। অনেক জোর করে স্যারকে রাজি করানো হল।পড়ানো শুরু করলেন নাজমূল স্যার।

স্যারের বাসা থেকে জিনিয়াদের বাসা দুই কিলোমিটারের  পথ। কিন্তু এই পথ কোন এক অজ্ঞাত কারনে তিনি প্রতিদিন হেটে হেটেই অতিক্রম করেন। পড়াশোনা চলছে জোর কদমে। প্রতিদিনই চা নাস্তা। প্রতিদিন পড়াশোনা। ইতোমধ্যে দুইমাস পার হল। ২য় সাময়িক পরীক্ষায় জিনিয়া প্রথম হয়েছে। সবার মুখে হাসি খুশি। চলছে  স্যারের জয়ধ্বনি।

স্যারের ভাব ভঙ্গিমা, কথা বার্তা, আচরন সবই জিনিয়ার খুবই ভালো লাগতে শুরু হল। কিশোরী বয়সের এই ভালোলাগা দিনে দিনে ভালোবাসার দিকে গড়াচ্ছিল। মনের গহীন কোনে বয়সের দোষ বা ভালোবাসা যাই হোক না কেন ভালোবাসা চরম আগ্রহে রুপান্তরের দিকে মোড় নিচ্ছে। ভাবনার নদী বয়ে উঝানেতে তরী বাওয়া শুরু হল জিনিয়ার। মনে মনে সে ভীষন খুশি। স্যারের পিটুনীও তার কাছে ভালো লাগে। বকুনিও মিস্টি লাগছে। স্যারকেও এই ভালোবাসার কথা জানানোর কথাও ভাবছে সে। রোমান্টিক মুভিও দেখা শুরু করেছে সে।

সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন নাজমুল স্যার। সাদাসিদে সরল টাইপ বলা যায়। এসব নিয়ে কখনো ভাবেন নি। ভাবার প্রশ্নই উঠেনা।

৫ মাস পেরিয়ে গেল। জিনিয়া স্যারকে তার মনের কথা খুলে বলতে পারে নি। চলছে সব কিছুই স্বাভাবিক শুধু,জিনিয়ার মনের ভিতর ঝড় চলছে। কিন্তু একদিন জিনিয়ার মনের আশায় আরেকটু সুবাতাস ছড়িয়ে দিয়ে নাজমুল স্যার বললেন '"
জিনিয়া,  তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল, কিছু মনে না করলে বা রাগ না করলে বলতে পারি?
বলেন স্যার, কোন রাগ করবো না।"
জিনিয়ার মুখটা লজ্জায় ও আনন্দে লাল হয়ে উঠলো। মাথা উপর দিকে উঠাতে পারছেনা সে। উত্তেজনায় নাকের উপর ও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
কিন্তু সেদিন নাজমুল স্যার কিছুই বললেন না। পরে বলবেন বলে এড়িয়ে গেলেন।চলে গেলেন সেদিনকার মতো।

স্যারের এই কথাটা জিনিয়ার মনে উত্তাপ আরো বাড়িয়ে দিল। রাতদিন এসব ভাবতে ভাবতে জিনিয়ার পড়াশুনা লাটে উঠতেছে। জিনিয়া সিদ্ধান্ত নিল সামনের শুক্রবারে যে করেই হোক সে স্যারকে তার ভালোবাসার কথাটা বলবে। এদিকে নাজমুল স্যারও মনে মনে ভেবে রেখেছেন যে করেই হোক না বলা কথাটা জিনিয়াকে তিনি বলবেনই। সামনে ঈদ। বলতে যে তাকে হবেই।

স্যার কথাটা বলেন না, প্লিজ। আমি রাগ করবো না। না বললেই আমি রাগ করবো --এটা ছিল গত কিছুদিনকার জিনিয়ার নিত্য ডায়লগ। নাজমুল স্যারও কাল বলবো কাল বলবো বলে কথাটা লজ্জায় কিছুতেই বলতে পারছেন না। অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।

কুরবানীর ঈদ। আর মাত্র দুই দিন বাকি। অাগামীকালই বাড়ীর উদ্দ্যেশে রওনা দিবেন। আজই তাকে কথাটা বলতে হবে জিনিয়াকে। কিন্তু আজ যে শুক্রবার। উহ!  টিউশন বন্ধ। মনটাই খারাপ হয়ে গেল নাজমুল স্যারের। ফোনটা বেজে উঠলো। মন খারাপ নিয়েই ফোনটা রিসিভ করলেন। জিনিয়ার মায়ের নাম্বার। তবে জিনিয়ার কন্ঠ।  স্যার আজ একটু আসতে হবে, ঈদের পরেতো অাপনি এক সপ্তাহ আসবেন না। ঈদের পরেই আমার পরীক্ষা। গনিতের একটা চ্যাপ্টার বাকি আছে। আজ ওটা শেষ করে দিবেন।
আচ্ছা। ১১টায় আসবো।

ঘড়িতে বরাবর ১১টা। জিনিয়াদের দরজার সামনে দাড়ালেন নাজমুল স্যার। কলিং বেলে চাপ দেয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত কররছেন। যে করেই হোক জিনিয়াকে আজ কথাটা বলতেই হবে। কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে গেল। জিনিয়া মনে হয় দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরে ঢুকতেই একটা কড়া  পার্টি পারফিউমের ঘ্রান নাকে প্রবেশ করলো। পাশেই বড় ঘোমটা দিয়ে চমৎকার শাড়ী পরা কে একজন দাঁড়িয়ে। নাজমুল স্যার সেদিকে বেশি খেয়াল না করেই। জিনিয়ার পড়ার রুমে প্রবেশ করলেন। কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করলেন তিনি। প্রতিদিনের আগোছালো রুমটা আজ পরিপাটি করে  সাজানো। আবারো সেই পারফিউমের ঘ্রান। লাল জামদানি পরা সেই মেয়েটা আবারো জিনিয়ার পড়ার ঘরে ডুকলেন। ভালো করে খেয়াল করতেই নাজমুল স্যারতো অবাক। এ যে জিনিয়া! স্যারের দিকে মুখ পরতেই লজ্জায় মুখ ঢাকলো সে। পড়ার সেই চেয়ারটাতে বসলো সে।

জিনিয়াকে আজ সুন্দর লাগছে। লাল একটা জামদানি পরেছে সে। মুখে হালকা মেইকাপ নেয়াতে চেহারা আরো উজ্জল লাগছে। হাতে মেহেদি ও চুড়ি পরেছে। মোট কথা সে সেজেগুজেই এসেছে সে। বাসায় কারো কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। ছোট বোনটাকেও আজ দেখা যাচ্ছে না । কি ব্যাপার জিনিয়া? আজ এত সেজেগুজে কেন?  কোথাও কি যাচ্ছো নাকি? বাসার বাকিরা কোথায়?

কোথাও যাচ্ছিনা। সাজতে মন চাইছিল তাই সাজলাম। বাসায় কেউ নেই। সবাই নানুর বাসায় গেছে। ফিরতে রাত হবে। আজ আমি বাসায় একা। স্যার আমাকে কি খারাপ লাগছে?  এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল জিনিয়া। নাজমুল
স্যার নিরুত্বর। হালকা লজ্জা ও ভয় মিশ্রিত মুখে জিনিয়ার দিকে আরেকবার তাকালেন। আজ কেন জানি সত্যিই জিনিয়াকে নারী নারী মনে হচ্ছে। ওভাবে এতদিন ভালো করে তাকানোই হয়ে উঠেনি। কড়া পারফিউমের ঘ্রানটা আবারো ফ্যানের বাতাসে নাক ছুয়ে গেল।

  কোন এক বিপদের অাশংকা করলেন কামরুল স্যার।

সোমবার, ৭ মে, ২০১৮

অামাদের সোনালী শৈশব বনাম এ যুগের প্রেসার কুকার

আমি নচিকেতার অন্ধ ভক্ত সেই স্কুল জীবন থাকতেই। তার গান প্রায় শুনতাম। আজ একটা গান শুনে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম । যদিও গানটি আগে অনেক শুনেছি। কিন্তু ঐ গানের একটি লাইন আমাকে ভাবনায় ফেলে দিল। গানটা আমাকে নিয়ে গেলো আমার সোনালী ও দুরন্ত হাসি আনন্দের সেই শৈশবে। গানটায় ঐ লাইনটা এই রকম -

–“ছোট ছোট শিশুদের শৈশব চুরি করে
–গ্রন্থকীটের দল বানায় নির্বোধ”

কিন্তু এই শৈশব চুরির দায়ে কেও আমাদের অভিবাবকদের কে চোর বলে না । বরঞ্চ বেশিরভাগ লোকই ঐ বাবা মা কে আদর্শ বাবা মা বলে থাকেন। পাঠক, আপনারা নিশ্চয় প্রেসার কুকারের নাম শুনে থাকবেন। আমাদের  শিশুদের শৈশব এখন পুরোটাই একটা প্রেসার কুকারের মত।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। একটা ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতাম। তার পুরো দিনের সিডিওল দেখেতো আমি অবাক। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই গনিত প্রাইভেট,গনিত প্রাইভেট থেকে এসেই স্কুলের কোচিং,কোচিং শেষে নিয়মিত ক্লাশ,ক্লাস শেষে বাসায় আসার পথে ইংরেজী প্রাইভেট,প্রাইভেট শেষে এসে দু চার লোকমা খাওয়ার পর বা অনেক সময় অর্ধেক খাবারে সময় আমি এসে হাজির। বিকেলে আমি শেষই করলে আসে তার হুজুর। তারপর রাতের স্যার, তারপরতো বাকিটা সহজেই অনুমেয়।এই যদি হয় একটি পঞ্চম শ্রেনীর বাচ্ছার ডেইলি রুটিন তাহলে একবার ভেবে দেখুনতো এই বাচ্ছার শৈশব বলে কী কিছু আছে?

আগে আমরা স্কুলে পড়ার সময় বা কলেজে পড়ার সময় paragraph লিখতাম “your childhood memories”। এখন যদি শহরের কোন বাচ্ছকে এটা লিখতে বলা হয় তবে সে কী লিখবে? সেতো কাঁধে ব্যাগ, মায়ের বকুনি, বাবার শাসন, স্যারের মাইর ছাড়া আর কি শৈশব আছে তার? দুদন্ড বিশ্রাম নেয়ার ও সময় তার নেই। ফার্মের মুরগী এখন আমরা অনেকেই খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।কিন্তু ছেলেটা বা মেয়েটার শৈশব কেড়ে নিয়ে তাকে বানাচ্ছি সেই ফার্মের মুরগীই।

ব্যাগ কাধেই এদের শৈশব শেষ। এসব ছেলেদের দেখলে আমার সত্যিই আফসোস হয়। আমাদের শৈশব নিয়ে আমরা সত্যিই গর্বিত। সোনালী সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজো হারিয়ে যাই সুখের সাগরে।সেই আম, জাম, লিচু গাছে উঠে ফল খাওয়া। পুকুরে অনেক্ষন পর্যন্ত পাড়ার এবং বাড়ীর ছেলেদের সাথে সাঁতার কাটা। বিকেলে গোল্লাছুট, ফুটবল,কানামাছি খেলা,। কখনো বা সাত ঝিক,লুকোচুরি, এক্কা দোক্কা খেলা। ধানা কাটার মৌসুমে খড় রোদে শুকোতে দিলে সেখানে লুকোচুরি খেলা। নদীতে মাছ ধরা। বর্ষাকালে ভেলা তৈরি করে তাতে ছড়া। আরো কত কি?
এখন বাচ্ছাদের শৈশব চুরি করে আমরা গ্রন্থ কীটের দল এদেরকে নির্বোধই বানাচ্ছি।

কিন্তু শিশুদের এই যে শৈশব চুরি হচ্ছে বা তারা যে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের এই সুন্দর সোনালী শৈশব থেকে তা নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই। সবার মাথায় শুধু তাকে আরো দুটি বই বাড়তি পড়ানো যায় কিনা তা নিয়েই আছে। ফলে ছাত্রদের মাটির গন্ধ নেয়ার পরিবর্তে স্কুলব্যাগের সাইজটাই শুধু বাড়ছে। এখন এসব বাচ্ছাদের দেখলে মুখ লুকোতে ইচ্ছে করে লজ্জায়।আমরা খুনি। খুন করেছি এসব বাচ্ছার সোনালী শৈশব।

আমি বলছি না বাচ্ছাদের পড়াশুনায় ফাঁকি দিতে আমি চাইছি পৃথিবীর মুক্ত বাতাসে তারাও প্রানভরে নিঃশ্বাস নিক। তারাও হাসুক নির্মলভাবে। শুধু রেজাল্টের পরদিনের হাসি নয়।
নানা বিষয়ে নানা সংগঠন থাকলেও শিশু অধিকার বা শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন এখনো সিংগেল ডিজিটে বা আরো কম।
এসব বাচ্ছার প্রতিনিয়তই আমাদের দেয়া এই যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি পেতে চায়।তারা তাদের শৈশব ফিরে পেতে চায়।

আসুন শিশুদের সোনালী ভবিষ্যত গঠনের নিমিত্তে হলেও তাদেরকে কিছু সময় নিজের মত করে হাসার বা গাওয়ার সুযোগ করে দিই।
নইলে এদের শৈশব হত্যার দায় থেকে কখনো মুক্তি পাবোনা। বাবা মায়ের কাছে এটুকুই অনুরোধ আপনার সন্তানকে ফার্মের মুরগী বা গিনিপিগ বা প্রেসার কুকার বানাবেন না। শৈশবও আপনার বাচ্ছার একটি মৌলিক অধিকার।

শুক্রবার, ৪ মে, ২০১৮

ধর্ষকের নয় ধর্ষিতার মরনোত্তর বিচার চাই!!!!

ধর্ষন কোনও সাধারণ শারীরিক আক্রমণ নয়, এটা কোনও সাধারণ অপরাধ নয়। অনেক দাগী অপরাধের সাথে অপরাধ হিসাবে ধর্ষণের পার্থক্য হচ্ছে এই ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক এবং মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের উপরে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত তৈরী হয়। আক্রান্ত হবার পর ধর্ষিতার মানসিক অবস্থা বোঝার চাইতে দুর্বহ কোনও কিছু হতে পারেনা। এটা নিজের শরীরকেই একটা শবদেহের মতো বয়ে বেড়ানোর মতো। শারীরিক ক্ষত সেরে উঠলেও মানসিক ক্ষত প্রায়শই সারা জীবনেও সেরে ওঠেনা। বিশেষত যেখানে সমাজ এই ধরনের অপরাধের আক্রান্ত নারীর সেরে ওঠার দায়িত্ব নেয়না, তাঁর শুশ্রূষার দায়িত্ব নেয়না, সেখানে এর পরিণতি আরো করুন, মর্মান্তিক হয়। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর একটি বড় অংশে নারী ও কন্যা শিশুদের ধর্ষণ বিষয়ে কোনও রকমের সচেতনতা তৈরী করা হয়না। একথা তো আমাদের সবারই জানা ভারতীয় উপমহাদেশে নারী ও কন্যা শিশুদের প্রতি বঞ্চনা, অপমান, শারীরিক আক্রমন সর্বগ্রাসী। তাই একদিকে যেমন নারী ও কন্যা শিশুদের শারীরিক ভাবে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশী, অন্যদিকে আক্রান্ত হলে পরিবার ও সমাজের যে সহানুভুতির উষ্ণতা দিয়ে আক্রান্ত নারীকে সেরে উঠতে সাহায্য করার কথা, তাও বিরল। তাই অপরাধ হিসাবে এর মাত্রা ভিন্ন, এটা সবচাইতে ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি। দুনিয়ার সকল দেশেই। আমাদের দেশে ধর্ষণ বলতে কেবল বলপূর্বক দেহসংশ্রবে বাধ্য করার ঘটনাকেই বোঝানো হয়, যদিও উন্নত বিশ্বে যেকোনো ধরনের “অনিচ্ছুক” শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করাকেই ধর্ষণ বলে ধরে নেয়া হয়। সেই অর্থে দাম্পত্য ধর্ষণের ঘটনাও প্রচুর ঘটে থাকে। বাংলাদেশে যে ধরনের ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তা সুস্পষ্ট ভাবেই শুধু নারীকে অনিচ্ছুক শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা নয়, এর সাথে যুক্ত হয় ভয়াবহ রকমের শারীরিক নির্যাতন বা ভায়োলেন্স এর ঘটনা। প্রায়শই আক্রান্ত নারীকে হত্যা করা হয়। সকল অর্থেই ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ, ব্যক্তি পর্যায়ে এবং সামাজিক পর্যায়ে যে ক্ষত সেরে ওঠার নয়।
কিন্তু কিছুদিন পূর্বে ঘটে যাওয়া ধর্ষনের ঘটনায়........
সবাই দেখতেছি তাসফিয়াকেই গালি দিচ্ছে কেও কিন্তু অাদনানের দিকে অাঙুলও তুলছে না। গত কয়েক দিনের পত্র পত্রিকা, অনলাইনে শুধুই শুনতে পাচ্ছি ও দেখতে পাচ্ছি একটিই কর্ম আর তা হলো তাসফিয়া ও তার পরিবারের মুন্ডুপাত। অাদনানদের বিছিয়ে রাখা ফাঁদে কত মেয়ের যে সর্বনাশ হচ্ছে তা অাপনার অামার বোনদের বেলায় ঘটার অাগ পর্যন্ত বুঝতেই পারবেনা অামাদের এই পু্রুষতান্ত্রীক সভ্যতা। কত অাবেগের মায়াজালে পড়লে এতটুকুন একটা মেয়ে ঘর ছাড়তে পারে  তা কল্পনা করুন?অার হা তাসফিয়া ঘর ছেড়েছে একটি অপরাধ করেছে অার অামরা পু্রুষরা তাকে এনে ধর্ষন করে হত্যা করে ফেলে রেখে গেছি। কোনটা বেশি অমানবিক ও নির্মম হে পুরুষজাতি! হে সভ্য অাবরনের ধোকাবাজেরা! কি উপাধি দিতাম অাপনাদের তা অামার কলমে অাসছে না।

তাসফিয়াকে নিজের বোন ভেবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে ভাবুনতো চোখ বন্ধ করে একবার! না, জানি সেটা অাপনি ভাববেন না। কারন সেটা অাপনাদের মাথায়ই অাসবেনা। মেয়েদের দোষ দিয়ে যে কোন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা এ যুগে সহজ। হয়তো ভাবছেন তাসফিয়াকে কেন অামি ডিফেন্ড করছি? জ্বি না ভাই, অামি তাসফিয়াকে  ডিফেন্ড করছি না। ডিফেন্ড করছি অাপনার অামার বোনকে। একটা ভুলের জন্য কেও ধর্ষনের বা খুন হয়ে যেতে পারেনা! তাকে শুধরানোর..

তাসফিয়ারা কেন বাইরে গেছে তাই তাকে ধর্ষন করে হত্যা করে ফেলে রেখে যাবেন? ও অপরাধ করেছে বাহিরে একা বেরিয়ে কিন্তু সে তো জানতোনা সভ্যতার মুখোশ পরা মানুষরূপী হাজারো হায়েনা তাকে ছিড়ে খাওয়ার জন্য ওৎপেতে অাছে।

কোথায় ধর্ষনের ঘটানা হলেই কিছু মানুষ অাছে যারা পোশাক বিতর্ক বা অন্যান্য অানুসাঙ্গিক বিষয়কে সামনে এনে ধর্ষিতা মেয়েটিকে, খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটিকে, তার পরিবারকে অাবারো খুন ও হত্যা করার জন্য কলম নিয়ে নেমে পড়। কিন্তু একবারও ভাবছিনা খুনিরা, ধর্ষকরা অাপনাদের মতামতে অারো উৎসাহিত হচ্ছে। তারা ভাবছে বাইরে মেয়েটি এলে তাকে ধর্ষন করে খুন করবে অার সবাই বলবে মেয়েটি কেন বের হইছে? এই সেই হাবিজাবি। অার ধর্ষকের জন্য হাসি ও করতালি।

অনেক জানোয়ার এমনও অাছে ধর্ষন নিয়ে হাসি ঠাট্টাও করতে কুন্ঠিতবোধ করেনা। এ প্রসঙ্গে প্রয়াত সাকার উক্তিটিও দিতে শুনি অনেক শুয়োরকে। কেও ঘর থেকে একা বের হলেই তাকে এনে ধর্ষন করে দিতে হবে? শুয়োরের বাচ্ছাদের যুক্তি দেখুন। অারে শুয়োর গত পরশু এই বাংলাদেশেই ঘরে একা পেয়ে এক ভাই তার অাপন বোনকে ধর্ষন করেছে তখন কি বলবি তোরা?

অন্ততপক্ষে ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে কিছু লেখ। ফাঁসির দিবতে একটা মিছিল কর। ধর্শকের মৃত্যুদন্ড দিতে সরকারকে চাপ দে। সেটাতো পারবিনা তোরা কারন তোদের একটা যুক্তি অাছে তোরা ছেলে এবং একা মেয়ে ফেলে গিলে খেতে অভ্যস্ত। অাপনি দেখবেন একটা ছেলে দশ বারোটা দৈহিক সম্পর্ক করার পরও সে ফিউর অার কোন মেয়ের ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলেই সতীত্ব! প্রশ্ন।

ইসলামে কি অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক ছেলেদের জন্য হালাল অার মেয়েদের জন্য হারাম?  অনেকে অাবার ধর্ষন ও ব্যাবিচারকে গুলিয়ে ফেলেন। ব্যাবিচারে শাস্তি পাবে দুজন কিন্তু ধর্ষনে শাস্তি পাবে শুধু ধর্ষক।

তবুও দুনিয়ার পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে অামি বলি
ধর্ষকের না ধর্ষিতার মরোনত্তর বিচার চাই।!!!!

বি:দ্র: অামি তাসফিয়ার পর্দাহীনতা ও অবাধ্যতাকে সমর্থন করিনা কিন্তু তার সাথে ঘটা বিষয়টা এর চাইতেও জঘন্য।