রবিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৭

সন্তান হারা বাবা মায়েদের জন্য সুসংবাদ ও শান্তনা

  ======বিসমিল্লাহীর রাহমানীর রাহীম====

পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এমন অনেক বর্ণনা আছে যাতে ধৈর্যশীলদের পুরস্কারের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। যে কেউ তার বিপদ ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করবেন, তিনিই এই বিশেষ পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবেন।

নিঃসন্দেহে সন্তানের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা। যেই বাবা-মা এই কঠিন পরীক্ষা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্যের মাধ্যমে মোকাবেলা করবেন, তাদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল প্রতিদান রয়েছে।  আমরা এই সম্পর্কে নীচে ৪টি পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ –

পবিত্র কুরআনে তাঁদের কথাঃ
__________________________
“এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই মহান আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি মহান আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হিদায়াত প্রাপ্ত।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫-১৫৭]

“… আর যারা সবর করে, মহান আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬]

“… যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত ১০]

পবিত্র কুরআনে আরো বেশ কিছু আয়াত রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য তথা সবর করার তাত্পর্যের উপরে।

রাসূলুল্লাহ(স:)এর হাদীস সমূহে তাঁদের কথাঃ
______________________________________

স্বাভাবিকভাবেই অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন – কেন মহান আল্লাহ তাঁদের সন্তান হারানোর মত কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন? এর উত্তর উপরে সূরা আল-বাকারার আয়াতের মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে যে মহান আল্লাহ আমাদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করবেন। এই পরীক্ষা যদি আমরা সবরের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে পারি তবে কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছু বরাদ্দ নেই আমাদের জন্য; আলহামদুলিল্লাহ।

মুসলিম মাত্রই আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের উপর এমন কোন বিপদ-আপদ আসে না যার বিনিময়ে আমাদের পাপসমূহ মোচন করা হয়। আমরা এই সংক্রান্ত হাদীসসমূহ একটু দেখতে পারি।

একঃ উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোন মুসলমানের উপর কোন বিপদ আপতিত হলে তার বিনিময়ে তার গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়, এমনকি ক্ষুদ্রতর কোন কাঁটা বিদ্ধ হলেও।

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬২৩৯]

দুইঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “মুমিন পুরুষ ও নারীর জান, সন্তান-সন্ততি ও তার ধন-সম্পদ (বিপদ-আপদ দ্বারা) পরীক্ষিত হতে থাকে। পরিশেষে সে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নিষ্পাপ হয়ে সাক্ষাৎ করবে।”

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ১ (বিবিধ অধ্যায়) হাদীস ৪৯, জামে’ আত-তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ]

তিনঃ আবু সা’ঈদ আল-খুদরী ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তারা উভয়েই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন যে, “কোন ঈমানদার ব্যক্তির এমন কোন ব্যথা-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, দুঃখ পৌঁছে না, এমনকি দুর্ভাবনা পর্যন্ত, যার বিনিময়ে তার কোন গুনাহ মাফ করা হয় না।

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬২৪২]

চারঃ সুহাইব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

“মু’মিন ব্যক্তির কাজ-কর্ম অবলোকন করলে খুব আশ্চর্য লাগে। কেননা তার সমস্ত কাজ তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি হয়ে থাকে শুধু মু’মিনদের জন্য, অন্যের জন্য নয়। যখন সে কল্যাণকর কিছু লাভ করে তখন সে (মহান আল্লাহর) শুকরিয়া আদায় করে, আর তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যখন সে কোন বিপদে পতিত হয়, তখন সে ধৈর্য ধারণ করে (সেটিও তার জন্য কল্যাণকর)।”

[সহীহ মুসলিমঃ হাদীস ৫৩১৮]

এবার আমরা সুনির্দিষ্টভাবে সন্তান হারানোর বিষয়ের হাদীসগুলো দেখব।

পাঁচঃ আবু মুসা আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

যখন কারও সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলেন যে, ‘তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবয করে ফেলেছ?’ তারা বলেন – ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তার কলিজার টুকরার জান কবয করে ফেলেছ?’ তারা বলেন – ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দা কি বলেছে?’ তারা বলেন – ‘আপনার বান্দা এই বিপদেও ধৈর্য ধারণ করে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে।’
তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর “বাইতুল হামদ” অর্থাৎ প্রশংসার গৃহ।’

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ১৪ (মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা অধ্যায়) হাদীস ১৩৯৫। জামে’ আত-তিরমিযী]

ছয়ঃ আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

‘‘যে কোন মুসলিমের তিনটি নাবালক সন্তান মারা যাবে, মহান আল্লাহ তাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের বরকতে জান্নাত দেবেন।’’

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ৭ (রোগী দর্শন ও জানাযায় অংশগ্রহণ অধ্যায়) হাদীস ৯৫২। মুত্তাফাক্বুন আলাইহিঃ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

সাতঃ আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! কেবলমাত্র পুরুষেরাই আপনার হাদীস শোনার সৌভাগ্য লাভ করছে। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যও একটি দিন নির্ধারিত করুন। আমরা সে দিন আপনার নিকট আসব, আপনি আমাদেরকে তা শিক্ষা দেবেন, যা আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন।’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘তোমরা অমুক অমুক দিন একত্রিত হও।’’

অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের নিকট এসে সে শিক্ষা দিলেন, যা মহান আল্লাহ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে যে কোন মহিলার তিনটি সন্তান মারা যাবে, তারা (মৃত সন্তানেরা) তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে আড় (প্রতিবন্ধক) হয়ে যাবে।’’

এক মহিলা বলল, ‘আর দু’টি সন্তান মারা গেলে?’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘‘দু’টি মারা গেলেও (তাই হবে)।’’

[রিয়াদুস সালেহীনঃ অধ্যায় ৭ (রোগী দর্শন ও জানাযায় অংশগ্রহণ অধ্যায়) হাদীস ৯৫৪। মুত্তাফাক্বুন আলাইহিঃ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

আটঃ কুররা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন বসতেন, তখন সাহাবীদের অনেকে তাঁর কাছে এসে বসতেন। তাদের মধ্যে একজনের অল্প বয়স্ক একটি ছেলে ছিল। তিনি তার ছেলেটিকে পেছনে দিক থেকে নিজের সামনে এনে বসাতেন। অতঃপর ছেলেটি মৃত্যুবরণ করল। সেই পিতা বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। তার ছেলের কথা মনে করে তিনি মজলিসে উপস্থিত হতে পারতেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে না দেখে জিজ্ঞাসা করলেন যে, “আমি অমুক ব্যক্তিকে কেন দেখছি না?” সাহাবীগণ বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি তার ছোট ছেলেটিকে দেখেছিলেন সে মৃত্যুবরণ করেছে।’

পরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার ছোট ছেলেটির কি হয়েছে?”

সে ব্যক্তি বললো, ‘ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে।’

তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ধৈর্য ধারণ করতে বললেন। তারপর তিনি বললেন, “হে অমুক! তোমার কাছে কোনটি পছন্দনীয় – তার দ্বারা তোমার পার্থিব জীবন সুখময় করা? না কাল কেয়ামতে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে তুমি প্রবেশ করতে চাইবে, তাকে সেখানেই পাওয়া – যেখানে সে পৌঁছে তোমার জন্য দরজা খুলে দিবে?”

সে বললো, ‘হে আল্লাহর রাসূল! বরং সে আমার জান্নাতের দরজায় গিয়ে আমার জন্য দরজা খুলে দেবে এটাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।’

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “তাহলে তা-ই তোমার জন্য হবে।”

[সুনানে আন-নাসাইঃ অধ্যায় ২১ (জানাযা অধ্যায়), হাদীস ২০৯০। তাহকিকঃ সহীহ]

নয়ঃ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্যে কাকে নিঃসন্তান বলে গণ্য কর?” বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমরা যার সন্তান হয় না তাকেই নিঃসন্তান মনে করি।’ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “সে ব্যক্তি নিঃসন্তান নয়, বরং সেই ব্যক্তি-ই নিঃসন্তান, যে তার কোন সন্তান আগে পাঠায় নি (অর্থাৎ যার জীবদ্দশায় তার সন্তান মৃত্যুবরণ করেনি)।”

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬৩১১]

অর্থাৎ যে ব্যক্তির কোন সন্তান তার আগে জান্নাতে পিতামাতার জন্য অপেক্ষা করবে না, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকেই নিঃসন্তান বলেছেন।

একটি লক্ষ্যণীয় ও জরুরী বিষয়ঃ
____________________________

একটি বিষয় লক্ষ্য করুন। যদি সন্তান বেঁচে থাকত, তবে সে বড় হয়ে জীবিকার তাগিদে, প্রয়োজনের তাগিদে কোন এক সময় বাবা-মা’র থেকে দুরে চলে যেতে হতো। সারাজীবন সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে নৈতিকতার অধঃপতনের বেড়াজালে হয়তো অনেক আগেই জড়িয়ে পড়তে পারতো সেই সন্তান। আপন বাবা-মাকে খুন করে ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া কিশোরী “ঐশী”-ই তার প্রমাণ।

“মৃত্যু” – এই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্য যা এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নেই। মৃত্যুর পূর্বের কষ্ট (সাকরাতুল মওত), কবরের আযাব, বিচার দিবসের সীমাহীন আতংক এবং জাহান্নামের কঠোরতম শাস্তি – এর সবকিছুর উর্ধ্বে রয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা আমাদের সন্তানেরা। তারা উর্ধ্ব আকাশে সাইয়িদুনা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর আশেপাশে অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলছে। সুবহানাল্লাহ!

সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের স্বপ্নের বর্ণনায় বলেছেন, “…. …আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে উপনীত হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চতুপার্শে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত বেশি আর কখনো আমি দেখি নি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি কে? আমাকে বলা হলো – ইনি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আর তার আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিৎরাতের (স্বভাবধর্ম) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে।”

[সহীহ বুখারীঃ অধ্যায় ৫৯ (সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়), হাদীস ৪২৯]

উপরন্তু এই বালক-বালিকারা তাঁদের বাবা-মায়ের জান্নাতে প্রবেশের কারণ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আবু হাসসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রাঃ) কে বললাম, ‘আমার দু’টি পুত্র সন্তান মারা গিয়েছে। আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -এর তরফ থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করবেন, যাতে আমরা মৃতদের সম্পর্কে আমাদের অন্তরে সান্ত্বনা পেতে পারি?’

আবু হুরায়রা (রাঃ) বললেন, “হ্যাঁ, তাদের ছোট সন্তানরা জান্নাতের প্রজাপতিতুল্য। তাদের কেউ যখন পিতা কিংবা পিতামাতা উভয়ের সংগে মিলিত হবে, তখন তার পরিধানের বস্ত্র কিংবা হাত ধরবে, যেভাবে এখন আমি তোমার কাপড়ের আঁচল ধরেছি। এরপর সেই বস্ত্র কিংবা হাত আর পরিত্যাগ করবে না যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তাকে তার বাবা-মা সহ জান্নাতে প্রবেশ না করাবেন।”

[সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫ (সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার অধ্যায়), হাদীস ৬৩৭০]

একটি প্রশ্নের উত্তরঃ

অনেক দম্পতির সন্তান গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।  সুবহানাল্লাহ, পৃথিবীর বুকে না এসেও গর্ভস্থিত সেই ভ্রুণ তার বাবা-মায়ের জন্য মহান আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে এবং জান্নাতের ফয়সালা করিয়ে নিবে।

মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! গর্ভপাত হওয়া সন্তানের (Miscarried Fetus) মাতা তাতে সওয়াব আশা করলে (ধৈর্যের মাধ্যমে) ঐ সন্তান তার নাভিরজ্জু (Umbilical Cord) দ্বারা তাকে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে।”

[সুনানে ইবনে মাজাহঃ অধ্যায় ৬ (জানাযা অধ্যায়), হাদীস ১৬৭৭, মিশকাত ১৭৫৪]

আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “গর্ভপাত (অসুস্থতাজনিত) হওয়া সন্তান (Miscarried Fetus) এর রব তার পিতা-মাতাকে যখন জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন তখন সে তার প্রভুর সাথে বিতর্ক করবে। তাকে বলা হবে, ওহে প্রভুর সাথে বিতর্ককারী গর্ভপাত হওয়া সন্তান! তোমার পিতা-মাতাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। অতএব সে তাদেরকে নিজের নাভিরজ্জু  (Umbilical Cord)  দ্বারা টানতে টানতে শেষে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।”

[সুনানে ইবনে মাজাহঃ অধ্যায় ৬ (জানাযা অধ্যায়), হাদীস ১৬৭৬, এই বর্ণনাটি দুর্বল]

ইমাম আন-নববী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মাজমু’ ফাতওয়া (৫/২৮৭) এ বলেছেন – মৃত সন্তানের ক্ষেত্রের হাদীসগুলো গর্ভপাত (অসুস্থতা জনিত) হওয়া সন্তানের বেলাতেও প্রযোজ্য হবে। মহান আল্লাহ সর্বোত্তম জানেন।

[মাজমু’ ফাতওয়া, ইমাম নববী (৫/২৮৭), হাশিয়াত ইবনে আবেদীন (২/২২৮)]

মুহাম্মদ সালিহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) সহ অধিকাংশ ফুক্বাহাদের মতে ভ্রুণ-এ রুহ সঞ্চার করা হয় ৪ মাস তথা ১২০ দিন পর।  রুহ সঞ্চারের পর থেকেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান মৃত্যু সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলো প্রযোজ্য হবে।  মহান আল্লাহ সর্বোত্তম জানেন।

[ফাতওয়া আল-লাজনাহ আল-দা’ইমাহ, ২১/৪৩৪-৪৩৮।

ফাতওয়া আল-মার’আহ আল-মুসলিমাহ, ১/৩০৩, ৩০৫।

আস’ইলাত আল-বাবিল মাফতুহ (মুহাম্মদ সালিহ আল-উসাইমীন); প্রশ্ন নং ৬৫৩]

সুবহানাল্লাহি বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল ‘আযীম।

মহান আল্লাহ কাছে প্রার্থনা করি – তিনি যেন সকল সন্তানহারা বাবা-মা’দের ধৈর্য ধারণ করার মাধ্যমে এই অশেষ পুরষ্কারের গর্বিত মালিক হওয়ার তাওফীক প্রদান করেন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

জামায়াতে ইসলামী কেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙ্গনের বিরোধীতা করেছিল!!!

জামায়াতে ইসলামীর অতীত ও বর্তমানের ভূমিকা থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী আপোসহীন। দুনিয়ার কোন স্বার্থে জামায়াত কখনও আদর্শ বা নীতির বিসর্জন দেয়নি। এটুকু মূলকথা যারা উপলব্ধি করে, তাদের পক্ষে ৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।
প্রথমত
মানুষের বেঁচে থাকার, বিশ্বাস অনুযায়ী চলার, পছন্দমত কাজ করার এবং ন্যায় বিচার পাওয়ার স্বাধীনতাই হচ্ছে প্রকৃত স্বাধীনতা।১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তখন অন্য অনেকের মতই জামায়াতে ইসলামীও চিন্তা করেছিল এই সংগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা আনার পরিবর্তে বিশ্বাস ও কাজের যতটুকু স্বাধীনতা ৪৭ এর পাকিস্তান অর্জনের মাধ্যমে এসেছিল, তাও হাতছাড়া হয়ে যায় কিনা। এই আশংকা থেকেই জামায়াত ওই সময়ের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেনি। শুধু জামায়াত নয়, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামীসহ অনেক দল এবং জনগণের বড় একটি অংশও স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারেনি। বলাই বাহুল্য, পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াত সে সময় অতি ক্ষুদ্র একটি দল ছিল।
দ্বিতীয়ত
বস্তুত বাংলাদেশ নামক যে জনপদে বর্তমানে আমরা বাস করছি, এই জনপদকে শুধু ১৯৭১ থেকে চিন্তা করলে হবেনা, এর ইতিহাস হাজার বছরের। সেই আর্য, পাল, সেন, সুলতানী, শাহী থেকে শুরু করে শায়েস্তা খান, ইসলাম খান, সিরাজুদ্দৌলা, ইংরেজ অতঃপর ৪৭ এর পাকিস্তান হয়ে বর্তমানের বাংলাদেশ। এর প্রতিটি ধাপেই বহুবার এই ভূখন্ডের মানচিত্র পরিবর্তন হয়েছে, নামের পরিবর্তন হয়েছে, শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, মানুষ কখনো স্বাধীনতা পেয়েছে, কখোনো বঞ্চিত হয়েছে।
৪৭ এর পাকিস্তান-ভারত বিভাজনের আগে এই অঞ্চলের মানুষগুলো চরমভাবে নিষ্পেষিত ছিল ব্রিটিশ শাসক আর হিন্দু শেঠ ও জমিদারদের হাতে। ৭১ এ বহু মানুষ বেঁচে ছিলেন যাদের স্মৃতিতে তখনও বৃটিশ-হিন্দুদের নিষ্পেষণ জ্বলজলে ছিল। ৭১ এ ভারতের সহায়তায় যুদ্ধ করে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দূর্বল পূর্ব পাকিস্তান আদৌ পৃথক একটি রাষ্ট্র গঠিত হতে পারবে নাকি ভারতের মত চানক্যবাদী রাষ্ট্রের করাল গ্রাসে বিলিন হতে হবে তা নিয়ে আশংকা ছিল সচেতন মানুষের মনে।
জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ ৪৭ এর অর্জন নস্যাত হয়ে ভারতের গোলামীতে পুনরায় ফিরে যাবার আশংকা থেকেই ৭১এর স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিতে পারেনি। যে ইসলামী আন্দোলন এ ভূখন্ডে ইসলামী রাষ্ট্র দেখতে চায় তা ব্রাহ্মণবাদী ভারতের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব তা পাগলেও বিশ্বাস করবে না।
তৃতীয়ত
জামায়াত মনে করেছিল শেখ মুজিব যেমন পশ্চিম পাকিস্তানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি তেমনি ভূট্টোও পূর্ব পাকিস্তানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। সুতরাং সমগ্র পাকিস্থানের একক কোন গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি না থাকায় দুই দেশ পার্লামেন্টের মাধ্যমে এমনিতেই ভাগ হয়ে যেত। অনেক দেশই শান্তিপূর্নভাব স্বাধীন হয়ে গিয়েছে। ভারত-পাকিস্থান তার প্রকৃত উদাহরণ। জামায়াত মূলত এটাই চেয়েছিল। তাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল ভারতের সহায়তায় এদেশ স্বাধীন হলে এদেশ অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে ভারতের বাজারে পরিণত হবে যাকে কখনোই প্রকৃত স্বাধীন বলা যাবে না। এ কারনেই কিছুদিন আগে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন “জামায়াত যে আশঙ্কায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি, দেশ এখন সেদিকেই যাচ্ছে।”
চতুর্থত
আদর্শগত কারণেই জামায়াতের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহকগণের সহযোগী হওয়া সম্ভব ছিল না। যারা ইসলামকে একটি পূর্ণাংগ জীবন বিধান বলে সচেতনভাবে বিশ্বাস করে, তারা এ দুটো মতবাদকে তাদের ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী মনে করতে বাধ্য। অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস দলের আদর্শ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। জামায়াতে ইসলামী তখন থেকেই এ মতবাদের অসারতা বলিষ্ঠ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশে যারা ভাঙ্গনের পক্ষে কাজ করেছিল তাদের অধিকাংশই ছিল সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহক। আর সমাজতন্ত্রের ভিত্তিই হলো ধর্মহীনতা।
পঞ্চমত
পাকিস্তানের প্রতি ভারত সরকারের অতীত আচরণ থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীকে এদেশের এবং মুসলিম জনগণের বন্ধু মনে করাও কঠিন ছিল। ভারতের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে সঙ্গত কারণেই তাদের যে আধিপত্য সৃষ্টি হবে এর পরিণাম মংগলজনক হতে পারে না বলেই জামায়াতের প্রবল আশংকা ছিল।
ষষ্ঠত
জামায়াত একথা বিশ্বাস করত যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশি হওয়ার কারণে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হলে গোটা পাকিস্তানে এ অঞ্চলের প্রাধান্য সৃষ্টি হওয়া সম্ভব হবে। তাই জনগণের হাতে ক্ষমতা বহাল করার আন্দোলনের মাধ্যমেই জামায়াত এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার অর্জন করতে চেয়েছিল।
সপ্তমত
জামায়াত বিশ্বাস করত যে, প্রতিবেশী সম্প্রসারণবাদী দেশটির বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচতে হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রভুক্ত থাকাই সুবিধাজনক। আলাদা হয়ে গেলে ভারত সরকারের আধিপত্য রোধ করা পূর্বাঞ্চলের একার পক্ষে বেশি কঠিন হবে। মুসলিম বিশ্ব থেকে ভৌগলিক দিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন এবং ভারত দ্বারা বেষ্টিত অবস্থায় এ অঞ্চলের নিরপত্তা প্রশ্নটি জামায়াতের নিকট উদ্বেগের বিষয় ছিল।
অষ্টমত
জামায়াত একথা মনে করত যে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে ভারতের সাথে সমমর্যাদায় লেনদেন সম্ভব হবে না। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যে সব জিনিস এখানে আমদানি করা হতো, আলাদা হবার পর সে সব ভারত থেকে নিতে হবে। কিন্তু এর বদলে ভারত আমাদের জিনিস সমপরিমাণে নিতে পারবে না। কারণ রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের আমাদের প্রয়োজন নেই। ফলে আমরা অসম বাণিজ্যের সমস্যায় পড়ব এবং এদেশ কার্যত ভারতের বাজারে পরিণত হবে।
নবমত
জামায়াত পূর্ণাংগ ইসলামী সমাজ কায়েমের মাধ্যমেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজিক ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সকল বৈষম্যের অবসান করতে চেয়েছিল। জামায়াতের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে,আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েম হলে বে-ইনসাফী, যুলুম ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের সত্যিকার মুক্তি আসবে।
এসব কারণে জামায়াতে ইসলামী তখন আলাদা হবার পক্ষে ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে এদেশে যারাই জামায়াতের সাথে জড়িত ছিল, তারা বাস্তত সত্য হিসাবে বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র বলে মেনে নিয়েছে। যে জামায়াত বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য, বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য, ইসলামের আদর্শকে উচ্চকিত রাখার জন্য পাকিস্তান ভাঙ্গনের বিরোধীতা করেছে সে জামায়াত কখনোই বাংলাদেশবিরোধী হতে পারে। এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করেছে জামায়াত। এই ভূখণ্ডকে সব ধরণের অকল্যাণ থেকে রক্ষার জন্য জামায়াতের কর্মীরা জীবনবাজী রাখতে প্রস্তুত।
স্বাধীনতার বিরোধিতা আর যুদ্ধাপরাধ এক জিনিস নয়
মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করা আর যুদ্ধের সময় অপরাধ করা এক জিনিস নয়। যে কোন একটি কাজের বিরোধিতা করার অধিকার সকলেরই আছে। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ৪৭ এ ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন অনেকেই, কিন্তু পাকিস্তান হয়ে যাবার পর তা মেনে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে তারা পাকিস্তানের শাষন ক্ষমতায়ও এসেছেন, তারা মনে করেছিলেন পাকিস্তান ভাগ না হওয়াটাই ভাল হবে। এ ধরণের বিরোধিতা চিন্তা ও মত প্রকাশ স্বাধীনতারই অংশ। শেরে বাংলা লাহোর প্রস্তাব করলেও ৪৬ এর নির্বাচনে পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন, পরবর্তীতে সেই পাকিস্তানেরই মন্ত্রী হয়েছেন।
জনাব সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম বড় নেতা ছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে যখন বঙ্গদেশ ও আসামকে মিলিয়ে “গ্রেটার বেংগল” গঠন করার উদ্দেশ্যে তিনি শরৎ বসুর সাথে মিলে চেষ্টা করেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতো না। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোক। পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মুসলমানের স্বার্থরক্ষা এবং কোলকাতা মহানগরীকে এককভাবে হিন্দুদের হাতে তুলে না দিয়ে বাংলা ও আসামের মুসলমানদের প্রাধান্য রক্ষাই হয়তো তাঁর উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু পরে যখন তিনি পূর্ববঙ্গে আসেন, তখন তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে পাকিস্তানের দুশমন বলে ঘোষণা করা হয় এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোলকাতায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য তিনিই পরে পাকিস্তানের উজিরে আযম (প্রধানমন্ত্রী) হবারও সুযোগ লাভ করেন। বলিষ্ঠ ও যোগ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার প্রয়োজনে দুর্বল নেতারা এ ধরনের রাজনৈতিক গালির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গালি দ্বারা কোন দেশপ্রেমিক জননেতার জনপ্রিয়তা খতম করা সম্ভব হয়নি।
তাই ’৭১-এর ভূমিকাকে ভিত্তি করে যে সব নেতা ও দলকে “স্বাধীনতার দুশমন” ও “বাংলাদেশের শত্রু” বলে গালি দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে যতই বিষেদাগার করা হোক, তাদের দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও জনপ্রিয়তা ম্লান করা সম্ভব হবে না।
*অধ্যাপক গোলাম আযমের লিখিত “পলাশী থেকে বাংলাদেশ” বই থেকে সংকলিত।
কালেক্ট।

বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সাজেক ভ্রমনের রুটম্যাপ বিস্তারিত

সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের কাছে যে কয়টি ভ্রমণ গন্তব্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম হল রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত সাজেক ভ্যালী। তাই আমরা আপনাদের ভ্রমণের সুবিধার্থে নিয়ে এলাম সাজেক ভ্রমণের বিস্তারিত পোষ্ট।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের এক অনন্য আঁধার আমাদের মাতৃভূমি রূপসী বাংলা । আমরা বিভিন্ন দেশের গ্রীন ভ্যালী দেখতে যাই বা দেখার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমাদের দেশেও আছে তেমনই এক অপরূপা গ্রীন ভ্যালী, যার নাম সাজেক। ঢাকা থেকে মাত্র ৭/৮ ঘণ্টা দূরত্বে পার্বত্য অঞ্চলের রাঙামাটি জেলার সাজেক ভ্যালী অবস্থান। হাতে দুই দিন সময় নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন এ সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য, যা আপনার কল্পনায় গেঁথে থাকবে অনেক অনেক দিন।

সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত । সাজেক হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন । যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল । সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা , দক্ষিনে রাঙামাটির লংগদু , পূর্বে ভারতের মিজোরাম , পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা । সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে । রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই হয়ে এসে অনেক পথ হেঁটে সাজেক আসা যায় । খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার । আর দীঘিনালা থেকে ৪৯ কিলোমিটার । বাঘাইহাট থেকে ৩৪ কিলোমিটার ।

খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা আর্মি ক্যাম্প হয়ে সাজেক যেতে হয় । পরে পরবে ১০ নং বাঘাইহাট পুলিশ ও আর্মি ক্যাম্প । যেখান থেকে আপনাকে সাজেক যাবার মূল অনুমতি নিতে হবে । তারপর কাসালং ব্রিজ, ২টি নদী মিলে কাসালং নদী হয়েছে । পরে টাইগার টিলা আর্মি পোস্ট ও মাসালং বাজার । বাজার পার হলে পরবে সাজেকের প্রথম গ্রাম রুইলুই পাড়া যার উচ্চতা ১৮০০ ফুট । এর প্রবীণ জনগোষ্ঠী লুসাই । এছাড়া পাংকুয়া ও ত্রিপুরারাও বাস করে । ১৮৮৫ সালে এই পাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় । এর হেড ম্যান লাল থাংগা লুসাই । রুইলুই পাড়া থেকে অল্প সময়ে পৌঁছে যাবেন সাজেক । সাজেকের বিজিবি ক্যাম্প বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিজিবি ক্যাম্প । এখানে হেলিপ্যাড আছে । সাজেকের শেষ গ্রাম কংলক পাড়া । এটিও লুসাই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পাড়া । এর হেড ম্যান চৌমিংথাই লুসাই । কংলক পাড়া থেকে ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায় । যেখান থেকে কর্ণফুলী নদী উৎপন্ন হয়েছে ।সাজেক বিজিবি ক্যাম্প এর পর আর কোন ক্যাম্প না থাকায় নিরাপত্তা জনিত কারনে কংলক পাড়ায় মাঝে মাঝে যাওয়ার অনুমতি দেয় না । ফেরার সময় হাজাছড়া ঝর্ণা , দীঘিনালা ঝুলন্ত ব্রিজ ও দীঘিনালা বনবিহার দেখে আসতে পারেন । একদিনে এই সব গুলো দেখতে হলে যত তারাতারি সম্ভব বেড়িয়ে পড়বেন ।

খাগড়াছড়ির সিস্টেম রেস্তোরায় ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে ভুলবেন না ।খাগড়াছড়ি থেকে জীপগাড়ি (লোকাল নাম চাঁন্দের গাড়ি) রিজার্ভ নিয়ে একদিনে সাজেক ভ্যালী ঘুরে আসতে পারবেন । ভাড়া নিবে ৫০০০-৬০০০ টাকা । এক গাড়িতে ১৫ জন বসতে পারবেন । লোক কম হলে শহর থেকে সিএনজি নিয়েও যেতে পারবেন । ভাড়া ৩০০০ টাকার মতো নিবে । অথবা খাগড়াছড়ি শহর থেকে দীঘিনালা গিয়ে সাজেক যেতে পারবেন । বাসে দীঘিনালা জন প্রতি ৪৫ টাকা এবং মোটর সাইকেলে জন প্রতি ভাড়া ১০০ টাকা । দীঘিনালা থেকে ১০০০-১২০০ টাকায় মোটর সাইকেল রিজার্ভ নিয়েও সাজেক ঘুরে আসতে পারবেন । ফেরার সময় অবশ্যই সন্ধ্যার আগে আপনাকে বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প পার হতে হবে । তা না হলে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে । ক্যাম্পের ছবি তোলা নিষেধ এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখবেন ।

সিস্টেম রেস্তোরাঃ
খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই পানখাই পাড়ায় এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের রেস্তোরার অবস্থান । এখানে খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে পারবেন । যোগাযোগঃ ০৩৭১-৬২৬৩৪ , ০১৫৫৬৭৭৩৪৯৩ , ০১৭৩২৯০৬৩২২ ।

কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে শ্যামলী , হানিফ ও অন্যান্য পরিবহনের বাসে খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন । ভাড়া নিবে ৫২০ টাকা । শান্তি পরিবহনের বাস দীঘিনালা যায় । ভাড়া ৫৮০ টাকা । এছাড়া BRTC ও সেন্টমার্টিন্স পরিবহনের এসি বাস খাগড়াছড়ি যায় । যোগাযোগঃ সেন্টমার্টিন্স পরিবহন - আরামবাগঃ ০১৭৬২৬৯১৩৪১ , ০১৭৬২৬৯১৩৪০ । খাগড়াছড়িঃ ০১৭৬২৬৯১৩৫৮ ।শ্যামলী পরিবহন - আরামবাগঃ ০২-৭১৯৪২৯১ । কল্যাণপুরঃ ৯০০৩৩৩১ , ৮০৩৪২৭৫ । আসাদগেটঃ ৮১২৪৮৮১ , ৯১২৪৫৪ । দামপাড়া (চট্টগ্রাম)ঃ ০১৭১১৩৭১৪০৫ , ০১৭১১৩৭৭২৪৯ । শান্তি পরিবহন- আরামবাগ ( ঢাকা ) – ০১১৯০৯৯৪০০৭ । অক্সিজেন(চট্টগ্রাম) ০১৮১৭৭১৫৫৫২ । চট্টগ্রাম থেকেও খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন । BRTC এসি বাস কদমতলী(চট্টগ্রাম): ০১৬৮২৩৮৫১২৫ । খাগড়াছড়িঃ ০১৫৫৭৪০২৫০৭ ।

কোথায় থাকবেনঃ
খাগড়াছড়িতে পর্যটন মোটেল সহ বিভিন্ন মানের থাকার হোটেল আছে । দীঘিনালায় কয়েকটি হোটেল থাকলেও দীঘিনালা গেস্ট হাউজের মান কিছুটা ভালো ।

#) খাগড়াছড়িঃ
পর্যটন মোটেলঃ
এটি শহরে ঢুকতেই চেঙ্গী নদী পার হলেই পরবে । মোটেলের সব
কক্ষই ২ বিছানার । ভাড়াঃ এসি ২১০০ টাকা, নন এসি ১৩০০ টাকা । মোটেলের অভ্যন্তরে মাটিতে বাংলাদেশের মানচিত্র বানানো আছে । যোগাযোগঃ ০৩৭১-৬২০৮৪৮৫ ।

হোটেল ইকো ছড়ি ইনঃ
খাগড়াপুর ক্যান্টর্মেন্ট এর পাশে পাহাড়ী পরিবেশে অবস্থিত । এটি রিসোর্ট টাইপের হোটেল । যোগাযোগঃ ০৩৭১-৬২৬২৫ , ৩৭৪৩২২৫ ।

হোটেল শৈল সুবর্নঃ ০৩৭১-৬১৪৩৬ , ০১১৯০৭৭৬৮১২ ।
হোটেল জেরিনঃ ০৩৭১-৬১০৭১ ।
হোটেল লবিয়তঃ ০৩৭১-৬১২২০ , ০১৫৫৬৫৭৫৭৪৬ , ০১১৯৯২৪৪৭৩০ ।
হোটেল শিল্পীঃ ০৩৭১-৬১৭৯৫ ।

দীঘিনালাঃ
দীঘিনালা গেস্ট হাউজঃ এটি দীঘিনালা শহরের বাস স্ট্যান্ডের উল্টো পাশে অবস্থিত । এটি দীঘিনালার আবাসিক হোটেল গুলোর মধ্যে একটু মানসম্মত । এখানে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে রুম নিয়ে থাকা যাবে । নূর মোহাম্মদ(ম্যানেজার) - ০১৮২৭৪৬৮৩৭৭।

দীঘিনালার চাঁদের গাড়ির ড্রাইভার রাজ - ০১৮২০৭৪১৬৬২, ০১৮৪৯৮৭৮৬৪৯ । শিবু- ০১৮২০৭৪৬৭৪৪ । সাজেক যেতে গাইডের তেমন দরকার নেই । তবুও প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন । আজম(গাইড , দীঘিনালা) - ০১৫৫৭৩৪৬৪৪২ ।

পোস্টের মূল লেখকঃ Nizam Uddin (সামান্য সংক্ষেপিত)