মঙ্গলবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস : মনে উঁকি দেয়া কিছু প্রশ্ন করা যাবে কী?

শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস( ১৪ ডিসেম্বর)
কিছু প্রশ্ন করা যাবে কি?
_____________________________________________
গতকাল ছিল১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। প্রতি বছরের ন্যায় গতকালও হয়ত রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে ফুল দিয়ে গণহারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। রায়েরবাজারের গতকালের পরিবেশটা দেখলে মনে হবে, কতো না যত্ন করে এই জায়গাটাকে সুরক্ষিত এবং পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অবস্থা থেকে ভিন্ন কিছু নয়।
সন্ধ্যা হলে কেন্দ্রীয় শহীদি মিনারে বসে গাজার আসর। এক দল বাউন্ডুলে গিটার গাধে নিয়ে গান ধরে, “গাজার নৌকা পাহাড় তলি যায়, ও মিরা ভাই! গাজার নৌকা পাহাড় তলি যায়! গাজা খাব আটি আটি, মদ খাব বাটি বাটি”। সেখানকার অবস্থাটা এমন যে, সম্ভব হলে শহীদ মিনারের বুকেই গাজার চাষ শুরু করে দিবে কিংবা মদের বার খুলে বসবে! গাজার চাষ সম্ভব না হলেও মধ্যরাতে শহীদ মিনার হয়ে ওঠে অস্থায়ী মদের বার। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের মাস আসলেই এই স্থানগুলো হয়ে ওঠে দেশের সর্বোচ্চ তির্থস্থান। তেমনি রাত হলেই রায়েরবাজার বধ্যভূমি হয়ে ওঠে নেশাখোরদের আশ্রয়স্থল। লোক মুখে শোনা যায় সেটি নাকি হিরোইনচিদের অভয়্যারন্য । প্রতি বছর এই গর্বের এই মাসগুলো আসলে প্রশাসনের যেমন টনক নড়ে তেমনি আমাদের মত চুনেপুটি ব্লগাররাও এসব নিয়ে স্বরব হয়ে ওঠে। তাই এই সব স্থানের সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তিসহ আমাদের সকলের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করবার উদ্বার্ত আহব্বান জানিয়ে আমি মূল বক্তব্যে চলে যাচ্ছি।
এ যাবত পর্যন্ত শহীদ বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড কারা ঘটিয়েছে তার সঠিক উত্তর জানা না গেলেও তার বিপরীতে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে যাচ্ছি! যে প্রশ্ন ইতিহাসই বার বার সমানে টেনে নিয়ে আসে। আর প্রশ্ন না থাকলে উত্তরও আসবে না। তাই ইতিহাসের সেই প্রশ্নগুলো আবারো সামনে নিয়ে আসার চেষ্ঠা করছি। যদি সম্ভব হয়, তাহলে তথ্যসহ উত্তর দিয়ে আমার অশান্ত মনটাকে শান্ত করবার অনুরোধ রইল।
সেই দিন যেসব বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলিম চৌধুরী। সেই আলিম চৌধুরীর বিষয়ে ইতিহাস বলে, “১৯৭১ সালে ডাঃ ও মিসেস আলিম চৌধুরী ঢাকায় পুরানা পল্টনে একটি তিনতলা বাড়িতে বাস করতেন। চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলিম চৌধুরীর তিনতলা বাসার নিচতলায় ছিল তার নিজের ক্লিনিক ও উপরের দু’টি তলায় তারা নিজেরা বসবাস করতেন। ডাঃ চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক। আশ্চার্যের বিষয় হলো এই ডাক্তার পরিবারটি কট্টর পাকিস্তানী সমর্থক একজন আল বদর সদস্যকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তার নাম ছিল মাওঃ মান্নান।
পরবর্তি মাসগুলোর দৈনন্দিন জীবনের যে বর্ণনা মিসেস আলিম চৌধুরী দিয়েছেন তা ছিল যুক্তিতর্কের বাইরের এক পরিস্থিতির বিবরণ। নীচতলায় পাক সেনারা যাওয়া-আসা করত মাওঃ মান্নানের কাছে এবং প্রায়দিনই তারা সেখানে থাকতো অনেক রাত পর্যন্ত। আল বদর সদস্যরা মাওঃ মান্নান ও ডাঃ চৌধুরীর গেট পাহারা দিতো। অন্যদিকে উপর তলায় মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিদিন ক্লিনিকে আসতো ওখানে তাদের ফ্রি চিকিৎসা দিতেন ও প্রয়োজনে তারা ডাঃ আলিমকে গাড়িতে করে নিয়ে যেতো নিরাপদ স্থানে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধুরী মিসেস চৌধুরীকে ডেকে পাঠান ও জিজ্ঞেস করেন নীচতলায় আল বদরের আসা যাওয়া আর উপর তলায় মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা নিয়ে আপনারা কি ভেবেছেন? মিসেস চৌধুরী এর কোন উত্তর দিতে পারেন নি। কেন মাওঃ মান্নান কে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারেন নি,মিসেস চৌধুরী”। ( শর্মিলা বসুর লেখা, ডেড রেকনিং পুস্তকের,পৃঃ১৪৯-১৫০ দ্রঃ)
কিন্তু সেই আল বদর সদস্য মাওঃ মান্নান পরবর্তিতে ডাঃ আলিম চৌধুরীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ান। সেই দিনের বিবরণ,“ মিসেস চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিকালে ঢাকায় ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রচন্ড গোলাবর্ষন করেছিল। ঠিক ঐ সময়ে গায়ে কাদা মাটি মাখানো ছোট একটি মাইক্রোবাস এসে থামে মাওঃ মান্নানের দরজার সমানে। এ ধরনের গাড়ি সেখানে প্রায়ই যাওয়া-আসা করতো আর তাই এতে চৌধুরী পরিবারের লোকজন তেমন বিরক্ত বোধ করেন নি। ইতোমধ্যে দু’জন অস্ত্রধারী আল বদর সদস্য ডাঃ আলিম চৌধুরীর ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে চায়। ডাঃ চৌধুরী মাওঃ মান্নানের দরজায় অনেকবার ধাক্কা দিয়েছিলেন কিন্তু মাওঃ দরজা খুলেন নি। ওই দুই বন্দুকধারী ডাঃ আলিমকে নিয়ে চলে যায়। তার পরনে ছিল সাধারণ লুঙ্গি ও গায়ে ছিল বাসায় পরা জামা”। ( শর্মিলা বসুর লেখা, ডেড রেকনিং পুস্তকের,পৃঃ১৫১ দ্রঃ)
আর ডাঃ আলিমের ভাগ্যের বিপরীত ছিল না অন্যান্য ডাক্তারদের। “মিসেস চৌধুরী মিসেস ফজলে রাব্বীকে ফোন করলে তিনি জানান, ডাঃ ফজলে রাব্বীকেও একই সময়ে একই ভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ডাঃ চৌধুরীর ভাই হাফিজ ১৭ ডিসেম্বর বাসায় ফিরে আসেন।
তারা সকলে ডাঃ চৌধুরীর সন্ধান করেন কিন্তু কেউ কোন খবর দিতে পারেন নি। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর তার মরদেহ রায়ের বাজার খোলা ইটের ভাটায় আরো অনেক বুদ্ধিজীবি ও বিভিন্ন পেশাজীবীর লাশের সঙ্গে পাওয়া যায় যারা ছিলেন বসুর লেখা, ডেড রেকনিং পুস্তকের,পৃঃ১৫১-১৫২ দ্রঃ)
হত্যাকান্ডের উপর মিথ্যা রিপোর্ট কেন?
বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডগুলো ছিল নিঃসন্দেহে নির্মম এবং ভয়াবহ। কিন্তু তারপরও হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলোকে সেই সময়ে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা হয়েছে। যা আজও চলমান আছে। এতে করে বুদ্ধিজীবিদের প্রতি অতিরিক্ত সমবেদনা আদায় হয়েছিল কিনা তা জানা না গেলেও পরবর্তিতে সত্য প্রকাশিত হবার পর বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করবার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। সে সময় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলিমের দু’চোখ তুলে ফেলা হয়েছিল এবং হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ফজলে রাব্বির হৃদপিন্ড কেটে বের করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু স্বয়ং ডাঃ আলিম এবং ডাঃ ফজলে রাব্বির স্ত্রী বলেন ভিন্ন কথা!
মিসেস চৌধুরীর দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী,ডাঃ আলিম চৌধুরীর বুকে অনেকগুলো বুলেটের আঘাতের ছিল এবং বাম ললাট ও বাম তলপেটে ধারালো কোনো কিছু দিয়ে আঘাতের চিন্হ ছিল যা দেখে মনে হয়েছিল তাকে বেয়োনেট দিয়েও আঘাত করা হয়েছে। তার পরনে ছিল সেই গেঞ্জি, জমা আর লুঙ্গি যা পড়া অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। মিসেস চৌধুরী দেখেছিলেন যে তার মুখমন্ডল অস্বাভাবিক কালো হয়ে গেছে। কিন্তু তার চোখ অক্ষত ছিল। সে খবর টি বেরিয়েছিল যে, তার চোখ তুলে ফেলা হেয়েছিল সেটি সঠিক নয়।
ডাঃ ফজলে রাব্বির মরদেহ সম্পর্কে তাঁর স্ত্রী বলেন,“ তার বাম গাল ও তার কপালের বাম পাশে ছিল অসংখ্য বুলেটের চিন্হ। বুকেও অসংখ্য বুলেটের আঘাত ছিল তবে আমি তা গুনে দেখিনি। কিন্তু এটা ডাহা মিথ্যে কথা যে তার বুক চিরে ফেলা হয়েছিল। আমি সেই বুক দু’হাত দিয়ে ধরেছি ও দেখেছি।”।( শর্মিলা বসুর লেখা, ডেড রেকনিং পুস্তকের,পৃঃ১৫২ ও ১৫৬ দ্রঃ)
তাহলে বুদ্ধিজীবিদের হত্যার বিবরন নিয়ে এই মিথ্যাচার কেন?
বুদ্ধিজীবিদের আসল হত্যাকারী কারা?
দেশ স্বাধীন হবার পর ডাঃ চৌধুরীর পরিবার মাওঃ মান্নানের উপর হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেন। কিন্তু মাওঃ মান্নান অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে যান। তখন মাওঃ মান্নানের ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করে বলা হয়, একে ধরিয়ে দিন। মাওঃ মান্নান খন্ডকালীন সময়ে ধরা পড়লেও পরবর্তিতে অজানা কারণে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। সেই মাওঃ মান্নান পরবর্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তার নিজ মালিকানায় একটি সংবাদ পত্রও ছিল। এবং সবচেয়ে মজার বিষয় এই মাওঃ মান্নান পরবর্তি সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীও হয়েছিলেন। (সূত্রঃ ডেড রেকনিং,পৃঃ১৫৪ দ্রঃ)
তাহলে প্রশ্ন হল, এই মাওঃ মান্নানকে কেন বিচারের মুখোমুখি করা হলো না?
এটা ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও বিশ্বাস করা হয় যে, পাকিস্তান সেনাবহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি খান ছিলেন স্বাধীনতার সমর্থক বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের হত্যাকান্ডের মুখ্য পরিকল্পনাকারী। ধারণা করার প্রাথমিক কারণ হচ্ছে অভিযোগ করা হয়ে থাকে যে তার লেখা বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের নামের তালিকা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশীদের হাতে পড়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো সরকার গঠিত হামিদুর রহমান কমিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড নিয়ে মেজর জেনারেল রাও ফরমান ও তৎকালীন ঢাকা জেলা প্রশাসক মেজর জেনারেল জামসেদকে জেরা করা হয়েছিল। তারা বলেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া তালিকানুযায়ী তারা কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন। তবে মেজর জেনারেল রাও ফরমান পরামর্শ দিয়েছিলেন কাউকে গ্রেফতার না করার জন্য। তাছাড়া গোযেন্দারা যে নামের তালিকা দিয়েছিল তা ছিল গেরিলা নেতাদের কোন বুদ্ধিজীবিদের নয়। আর মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভারতীয় আক্রমন প্রতিহত করতে ব্যস্ত ছিল তাদের হাতে এতোটাও সময় ছিল না যে পরকিল্পনা করে কাউকে হত্যা করবে। (সূত্রঃ ডেড রেকনিং,পৃ,১৫৩দ্র)।
আর যদি ভাবা হয় বাঙালী পাকিস্তান পন্থিরা তাদের হত্যা করেছে তাহলে আরও কিছু কথা বলতে হয়। যুদ্ধের শেষ সময়ে পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হবার পর মুক্তিযোদ্ধারা পাইকারী হারে রাজাকার আল বদর নিধন শুরু করে। তখন বাঙাল রাজাকাররা নিজেদের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলেন। তখন আর বদর বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যরাই ছিল পলাতক। আর এই সময়ে তাদের দ্বারা এরকম একটি প্ল্যানেড হত্যাকান্ড বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর ছিল না।( ডেড রেকনিং,পৃঃ ১৫৩-১৫৪ দ্র)
স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও সেই হত্যাকান্ডের কোন তদন্ত করা হয় নি। সরকারীভাবে কোন উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়নি। যা দেশ স্বাধীন হবার পরপরই করা উচিত ছিল। কিন্তু কেন করা হলো না???
ইতিহাসে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড নিয়ে সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে না পেলেও ইতিহাসের বুকে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম যাতে সংশ্লিষ্ঠ কতৃপক্ষ দয়াপরবশ হয়ে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের সঠিক ইতিহাস জাতির সামনে প্রকাশ করে আমাদের বাধিত করেন।

বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

রোহিঙ্গা ইতিহাস নিয়ে সাতটি বিচিত্র তথ্য

রোহিঙ্গা ইতিহাস নিয়ে সাতটি বিচিত্র তথ্য

টেকনাফের অস্থায়ী শিবিরে রোহিঙ্গা শরণার্থী
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এখন বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? এখানে রোহিঙ্গা জাতির প্রায় ভুলে যাওয়া ইতিহাসের কিছু তুথ্য তুলে ধরা হলো:
রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি আরাকান ছিল স্বাধীন রাজ্য। ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোডপায়া এটি দখল করে বার্মার অধীন করদ রাজ্যে পরিণত করেন।
আরাকান রাজ্যের রাজা বৌদ্ধ হলেও তিনি মুসলমান উপাধি গ্রহণ করতেন। তার মুদ্রাতে ফার্সি ভাষায় লেখা থাকতো কালেমা।
আরাকান রাজ দরবারে কাজ করতেন অনেক বাঙালি মুসলমান। বাংলার সাথে আরাকানের ছিল গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
ধারণা করা হয় রোহিঙ্গা নামটি এসেছে আরাকানের রাজধানীর নাম ম্রোহং থেকে: ম্রোহং>রোয়াং>রোয়াইঙ্গিয়া>রোহিঙ্গা। তবে মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যে আরাকানকে ডাকা হতো রোসাং নামে।
১৪০৬ সালে আরাকানের ম্রাউক-উ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নরমিখলা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলার তৎকালীন রাজধানী গৌড়ে পলায়ন করেন। গৌড়ের শাসক জালালুদ্দিন শাহ্ নরমিখলার সাহায্যে ৩০ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে বর্মী রাজাকে উৎখাতে সহায়তা করেন। নরমিখলা মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ্ নাম নিয়ে আরাকানের সিংহাসনে বসেন। ম্রাউক-উ রাজবংশ ১০০ বছর আরাকান শাসন করেছে।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যচর্চ্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল রোসাং রাজ দরবার। মহাকবি আলাওল রোসাং দরবারের রাজ কবি ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন মহাকাব্য পদ্মাবতী। এছাড়া সতী ময়না ও লোর-চন্দ্রানী, সয়ফুল মুল্ক, জঙ্গনামা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছিল রোসাং রাজদরবারের আনুকূল্যে।
ভাই আওরঙ্গজেবের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরাজিত হয়ে মোগল যুবরাজ শাহ্ সুজা ১৬৬০ সালে সড়ক পথে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে আরাকানে পলায়ন করেন। তৎকালীন রোসাং রাজা চন্দ্র সুধর্মা বিশ্বাসঘাতকতা করে শাহ্ সুজা এবং তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এর পর আরাকানে যে দীর্ঘমেয়াদী অরাজকতা সৃষ্টি হয় তার অবসান ঘটে বার্মার হাতে আরাকানের স্বাধীনতা হরণের মধ্য দিয়ে।
সূত্র: রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস, এন. এম. হাবিব উল্লাহ্, এপ্রিল-১৯৯৫

সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

সিরিয়া থেকে বার্মা : আইলানদের একটাই দোষ ওরা মুসলীম

প্রিয় পাঠক, আপনাদের হয়তো মনে আছে, আইলান কুর্দির কথা। মধ্যপ্রাচ্যের বিরাজমান যুদ্ধে শরণার্থী হয়ে সাগর পাড়ে পড়ে থাকা ছোট্ট শিশু আইলানের নিথর দেহের ছবি বিশ্ব মানবতাকে ধিক্কার দিয়েছিল। বিশ্বগণমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশের পর শোক, নিন্দায় সরব হয়ে উঠেছিল গোটা বিশ্ব।
আইলানের পুরো নাম আইলান কুর্দি। সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত কোবানি শহরে ছিল তাদের বাড়ি। সম্প্রতি সিরীয় শহরটি দখল করে নেয় ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিরা। আইএস-এর কবল থেকে বাঁচতে ইউরোপের কোনো দেশে যাওয়ার জন্য তিন বছরের শিশু সন্তান আয়লান, পাঁচ বছরের গালিফ ও স্ত্রী রেহানকে নিয়ে নৌকায় করে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন তার পিতা আব্দুল্লাহ। তুরস্কের সমুদ্র তীরের কাছাকাছি এসে ডুবে যায়  নৌকাটি। তারপর সব শেষ। আব্দুল্লাহ নিজে বাঁচলেও প্রাণ হারিয়েছে তার দুই শিশুপুত্র ও স্ত্রী। তবে ডুবে যাওয়া আইলান ও গালিপের দেহ ফেরত দিয়েছে সাগর। তুরস্কের বোদরাম সৈকতে ভেসে আসে আইলানের দেহ। লাল টি-শার্টি, নীল হাফ প্যান্ট আর জুতাজোড়া তখনও তার পায়ে। উল্টো হয়ে থাকা দেহটির ছবি প্রকাশিত হয় তুরস্কের গণমাধ্যমে। তোলপাড় শুরু হয় বিশ্বজুড়ে। আইলানের মরদেহের ছবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বমানবতার দুর্দশা।

এবার এমনই আরেক আইলানকে ফিরিয়ে দিয়েছে নাফ নদী। পলায়নপর রোহিঙ্গাদের নৌকার ওপর বার্মিজ সেনাদের গুলিতে নৌকা ডুবে যায় I জন্ম হয় আরেক মৃত আইলানের।
বাংলাদেশের টেকনাফে ভেসে এসেছে এক রোহিঙ্গা শিশুর নিথর দেহ। তবে পার্থক্য হলো আইলান কুর্দির পরনে সুন্দর পোশাক ছিল, পায়ে ছিল জুতোজোড়াও। কিন্তু এ হতভাগ্য রোহিঙ্গা শিশুর সেটাও ছিল না।
এক আইলান বিশ্ব বিবেককে এতোটাই নাড়া দিয়েছিল যে ইউরোপ তার সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এবারের এই রোহিঙ্গা শিশুর নিথর দেহ কি পারবে রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্ব মানবতাবোধের গোড়াটায় অন্তত একটা চরম ঝাঁকুনি দিতে?
কিন্তু একটি সমস্যা তো আছেই। সবাই মানুষ। সবার রক্ত লাল। কিন্তু তথাকথিত মানবতাবাদীদের কাছে সবাই সমান নয়। রোহিঙ্গারা সাগরে ভাসলেও সেই ‘মানবতাবাদীদের’ অন্তর এতদিন স্পর্শ করেনি।

করবে কি করে ওদের যে কোন পরিচয় নেই।  মুসলিম কি এখন মানুষের মত পরিচয় দেয়ার মতো কোনো পরিচয়?

বাংদেশ নিজেও একসময় ভারতে সরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। তৎকালীন ভারত যদি মুসলীম অমুসলীম জাত বেজাত বিবেচনা করতো তবে এই বাংলাও বিরান ভূমিতে পরিনত হতো। কোটি আইলান এভাবে মরে পচে যেতো।

কি বলবি আর?  পারতেছিনা। হাত কাঁপেছে। 

বিজয়ের ৪৬ বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি


আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা। একটি ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা এবং সার্বভৌমত্ব অনেক বড় নেয়ামত। ‘স্বাধীনতা’ নামক নেয়ামত থেকে যারা বঞ্চিত তারাই কেবল বুঝেন পরাধীনতার শৃঙ্খল কত বিষাদের। পৃথিবীর ইতিহাসে বিজয় ও বিজিতের ধারা চলমান। শাসন-শোষণের বিপরীতে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও সাধনা চিরকাল অব্যাহত আছে। প্রত্যেক জাতিকেই স্বকীয়তা ও অস্তি¡ত্ব লাভের আগে পরনির্ভরশীলতার ধাপটুকু অতিক্রম করতে হয়। আর এর জন্য কোনো কোনো জাতিকে দিতে হয় চরম মাশুল। আমাদের এই দেশ ও জাতির অস্তিত্ব লাভের পেছনেও এ পর্বটি পার হয়ে আসতে হয়েছে। অনেক কিছু বিসর্জনের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন জাতির অস্তিত্ব পেয়েছি।
আমরা কী হারিয়ে কী পেয়েছি-সেই প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। যেমন জাতীয়তাবোধ, দেশাত্মবোধ, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সামর্থ্য। কোনো জনগোষ্ঠী নিজেকে স্বাধীন জাতি হিসেবে তখনই ভাবতে পারে যখন তার মধ্যে জাতীয় চেতনাবোধ, ঐক্য ও সংহতি, আত্মনির্ভশীলতা, আত্মবিশ্বাস এসব মৌল উপাদান মোটাদাগে থাকে। দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি সদস্যের ওপর স্বাধীনতা সুরক্ষার পবিত্র দায়িত্ব বর্তায়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য যেমন একজন নাগরিকের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকবে, তেমনি রাষ্ট্রের ইমেজ যেন কোনোভাবেই ক্ষুন্ন না হয় সেদিকেও থাকবে তার সতর্ক দৃষ্টি। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ থাকলেই কেবল একজন নাগরিক প্রকৃত অর্থে নাগরিকের মর্যাদা লাভ করতে পারে।
আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ৪৫ বছর হয়ে গেল। আমাদের দেশটি আজ ৪৫বছরে পা রাখছে। জাতীয়ভাবে যৌবনের ধাপ পেরিয়ে পৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে আমরা। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের প্রত্যাশার দিগন্ত যতদূর বিস্তৃত ছিল সে তুলনায় প্রাপ্তির খতিয়ান কি সন্তোষজনক! একসাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের স্বপ্ন ছিল বিশাল, প্রত্যাশা ছিল দিগন্তপ্রসারী। স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে মনের মতো করে সবকিছু গড়বো, দেশকে সাজাবো অপরূপ সাজে, আমার মাতৃভূমি সবুজ শ্যামল এই বাংলা হয়ে উঠবে একটি স্বপ্নপুরী, জাতি হিসেবে আমরা আসীন হবো শ্রেষ্ঠত্বের আসনে-এসব নানা সুখ-ভাবনায় আমরা ছিলাম বিভোর। স্বপ্নের ঘোরে হারানো বেদনাকে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম অল্প দিনেই। সম্ভাবনার হাতছানি আমাদেরকে অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগই দেয়নি। কিন্তু আমাদের এই স্বপ্নের ঘোর কেটে যেতে বেশিদিন লাগেনি। সব স্বপ্ন হয়ে যায় ধূসর। যে প্রত্যাশা নিয়ে জাতি ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল সে প্রত্যাশার কিছুই পূরণ হয়নি। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তার কিঞ্চিৎও বাস্তবে পাইনি। স্বাধীনতার লাভের কিছুদিনের মধ্যেই এক চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। চারটি বিজয় দিবস পালন করতে না করতেই দুর্ভাগ্যজনক ট্রাজেডি, ষড়যন্ত্র, ক্যু-পাল্টা ক্যু পরিস্থিতিকে বিষিয়ে তোলে। অস্থিরতা ও হতাশায় ছেয়ে যায় পুরো জাতি।
আমাদের এই স্বপ্নভঙ্গের কারণ ছিল অনেক। তবে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল নেতৃত্বের ব্যর্থতা। যারা সামনে থেকে, নেতৃত্বের আসনে বসে আমাদেরকে বিজয়ের মুখ দেখিয়েছিল তারাই আমাদের স্বপ্নভঙ্গের প্রধান কারণ। তাদের বিজয়ের পূর্বের ও পরের আচরণের মধ্যে তফাৎ ছিল বিস্তর। বিজয়ের পূর্বে যারা জনগণের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন, বিজয়ের পর তারাই জনধিকৃত হলেন। ক্ষমতার মোহ তাদেরকে উম্মাদ করে তুলল। ‘এসো ভাই লুটেপুটে খাই’ এই নীতিই তাদের কাছে প্রাধান্য পেল। তাদের চারপাশে জড়ো হয়ে থাকা চাটুকারেরা দেশের সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারায় মেতে উঠল। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটাকে পুনর্গঠনের পরিবর্তে নিয়ে গেল চরম বিপর্যয়ের মুখে। ফলে লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এদেশ বিশ্বের দরবারে খেতাব পেল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে।
সে সময় ক্ষমতা ও লুটেপুটে খাওয়ার যে রাজনীতির সূচনা হয়েছিল তা দিন দিন বেড়েই চলছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে অনেকবার। শাসননীতিরও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তন হয়নি জনগণের ভাগ্যের। পূরণ হয়নি তাদের প্রত্যাশা। বাস্তবে রূপ লাভ করেনি তাদের স্বপ্ন। ইতোমধ্যে আমরা পেরিয়ে এসেছি বিজয়ের ৪৫টি বছর। এখনও এদেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। সীমান্তে লাশ পড়ে পাইকারি হারে। আমাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় বিশ্ব মোড়লেরা। প্রতিবেশী দাদাদের ইশারায় নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করি না। সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর লোলুপ দৃষ্টি এদেশের ওপর নিবদ্ধ। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা অন্তহীন সমস্যায় জর্জরিত। দারিদ্রের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছে অধিকাংশ মানুষ। না খেয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। ন্যূনতম চিকিৎসার অভাবে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে অসংখ্য লোক। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এদেশের সিংহভাগ শিশু। শুধু রাজধানীতেই ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। মানুষের মৌলিক অধিকার খাদ্য, শিক্ষা, চিকি ৎসা, বাসস্থান ইত্যাদি আজও নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা আমাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। ক্ষমতায় থাকা আর যাওয়ার নোংরা ও হিংস্র প্রতিযোগিতায় এ জাতির জীবন আজ ওষ্ঠাগত। সন্ত্রাসের কাছে আমরা সবাই জিম্মি। দুর্নীতিতে ইতোমধ্যে আমরা বেশ কয়েকবার হ্যাট্রিক করেছি। প্রায় ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে এখনও বিতর্ক হয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে কিনা। ইসলামকে কষে গালি দিলেও এর তেমন কোনো শাস্তির বিধান নেই এদেশে। ধর্ম-কর্ম পালনেও আজ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হতে হচ্ছে। মানুষের মৌলিক অধিকারই এখনও এদেশে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যারা রক্ষক তারাই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। তথাকথিত রাজনীতিবিদরা নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক দাবি করলেও তাদের অনেকের কা-কারখানা জাতিকে লজ্জায় নুইয়ে দেয়।
বিজয়ের চার দশক পরও যে এসব দেখতে হবে তা আমরা আগে ভাবিনি। বিজয়ের স্বপ্ন এভাবে ধূলিস্মাত হবে জানলে চড়ামূল্যের এই বিজয় আমরা আনতাম কিনা তা বিবেচনা করা যেত। যাঁরা রক্ত দিয়ে, নিজের অমূল্য জীবন দিয়ে আমাদেরকে এ বিজয় এনে দিয়েছেন তাদের কাছে আমরা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। ৪৫ বছর সময় কম নয়, স্বপ্নীল দেশ গড়ে তোলার জন্য এতটুকু সময়ই যথেষ্ট ছিল। আমাদের পরে বিজয় অর্জন করে অনেক দেশ চলে গেছে আমাদের চেয়ে বহুদূরে। এই সুদীর্ঘ সময়েও না পারা আমাদের চরম ব্যর্থতা। জাতি হিসেবে এটা আমাদের দীনতার প্রমাণ বহন করে।
আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়েছি। কিন্তু আমাদের এগিয়ে যাওয়ার গতিটা আশানুরূপ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলেও অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। একটি জাতির টিকে থাকার যে নৈতিক ভিত্তি আদর্শ ও নৈতিকতা তাতে চরম ধস নেমেছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে স্খলনের মাত্রা যেভাবে দিন দিন বেড়ে চলেছে তাতে কোনো রকম দাঁড়িয়ে থাকা নৈতিকতার স্তম্ভটিও ধসে পড়বে। ৪৫ বছর আগে আমরা জাতীয়ভাবে যতটা নৈতিকতার বলে বলীয়ান ছিলাম তা কিন্তু এখন নেই। সেই সময়ের মানুষদের মধ্যে অন্যায় ও পশুপ্রবৃত্তির এতটুকু উপস্থিতি ছিল না যা এখন আছে। আত্মপ্রতিষ্ঠা ও লোভের লাগামহীন ঘোড়া আমাদের কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা কেউ বলতে পারবে না। বাহ্যিক সূচকগুলোতে আমরা যতই এগিয়ে যাই নৈতিকতার ভিতটি নড়বড়ে হয়ে গেলে এ জাতির পতন অনিবার্য। এজন্য বাহ্যিক উন্নতির পাশাপাশি নৈতিক উন্নতির বিষয়েও ভাবতে হবে সবাইকে।

শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৬

অগ্রযাত্রার সংবিধান (zaker rubel)

              বিছিমিল্লাহীর রাহমানীর রাহীম

♦নাম : এই সংস্থার নাম হবে " অগ্রযাত্রা"

♦পরিচিতি :অগ্রাযাত্রা,  মেহরুন্নেছার মাঝে একটি সমাজ কল্যাণ ও সেবামুলক অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
মননশীল,  সৃজনশীল ওও সমাজ সেবক মানুষের আশা আকাংখার প্রতীক।
মেহেরুন্নেছা বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ থানার পূর্বে ছোট ফেনী নদীর তীরে অবস্থিত, এক মমতাময়ী মায়েের নাম। এই নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর মেহেরুন্নেছা নামের গোড়ড়াপত্তন।  এটি মধ্যম উন্নত এলাকা।  শিক্ষার হার প্রায় ৮০ %। অনেক জ্ঞানী গুনী লোক মেহেরুন্নেছার সুনাম ছড়িয়েছে দেশে ও বিদেশে।
মেহেরুন্নেছা প্রায় ৭০% প্রবাসী। তারা পৃথিবী বহু দেশে কাজ করে মেহেরুন্নেছা ও দেশের উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে। আছে ১০% পেশাজীবী। তারাও এলাকার উন্নয়ন ও দেশ গড়ায় ভুমিকা রাখছে।
১০% আছে শ্রমিক। তারা তাদের কর্ম দিয়ে কোন মতে পরিবার নিয়ে খেয়ে পড়ে ভালোই আছে।
আর ১০ % আছে হতদরিদ্র।  তারা কোন মতে দিন অতিবাহিত করছে।  মানুষের সাহায্য সহায়তায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।  অনেকে তাদের সাহায্য সহায়তা করতেছে ব্যক্তিগতভাবে। এই সাহায্য  তাদের তেমন কাজে আসছে না।  তারা দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাছে না।যার কারননে তাদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করতে না পেরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  একশ্রেনীর সার্থান্বেষী  মহল তাদের অবৈধ ব্যবসা ও ক্ষমতার কাজে এই গবির মানুষ গুলো কে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ হাসিল করছে।  যার ফলে আজ মেহেরুন্নেছায় মারামারি, হানা-হানি লেগেই আছে।  সমাজে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, যেনা ভ্যাবিচার বেড়েই চলছে। এর মূল সমস্যা সুশিক্ষার অভাব,  দারিদ্রতা,  ও ন্যায়বিচার না থাকা।
আর একা কারো পক্ষে এই দারিদ্রতা দূর করা সম্ভব না,দরকার সম্মমিলিত সাহায্য সহয়তা। এই অসহায় মানুষদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর জন্যই অগ্রযাত্রা নামক এই সংগগঠনের যাত্রা।

♦ধরন : অলাভজনক,অরাজনৈতিক,সমাজ কল্যান মূলক সংস্থা।

♦কর্ম পরিধি : সেবার কোন পরিধি থাকেনা তবুও  প্রাথমিকভাবে মেহেরুন্নেছা এলাকাই হবে এর পরিধি। পর্যায়ক্রমে এর পরিধি বাড়ানো হবে।

♦কার্যালয় :  আপাতত whatsap ই এই সংস্থার কার্যালয় থাকবে।

♦লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য :
================
"তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবতার কল্যানের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে "- আল কুরআন। প্রবিত্র কুরআনের এই ঘোষনার আলোকেই দুস্ত ও আসহায় মানুষের কল্যানে কাজ করাই এই সংস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

♦কর্মসূচী :
=========

১.সমাজ কল্যান
২.ছাত্রকল্যান
৩.সাংস্কৃতি বিষয়ক
৪.ক্রীড়া বিষয়ক
৫.যাকত বিভাগ
৬.
**বিস্তারিত আরো আসতে পারে সবার পরামর্শে।

♦ দরিদ্রদের সহযোগীতার ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্দলীয় মনেভব পোষন করা হবে। তবে দ্বীনি ভাইদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

♦সদস্য হওয়ার নিয়ম:
================
সংস্থার কার্যকরি পরিষদের অনুমুতিক্রমে যে কেও সমাজকল্যানের মানসিকতা থাকলে এ সংস্থার সদস্য হতে পারবেন। আপাতত মেহেরুন্নেছার বাসিন্দা হতে হবে।

সদস্য বৃদ্ধির জন্য সকল সদস্য সদা সক্রিয় থাকবে।

♦পরিচালনা পদ্ধতি :
===============
১||.একজন সভাপতি, একজন সেক্রেটারী, ১০ সদস্যের একটি কার্যকরী পরিষদ এবং একটি উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে এ সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে।

২|| সদস্যেদের ভোটে প্রতি এক বছরের জন্য সভাপতি ও সেক্রেটারি নির্বাচিত হবেন।।

৩|| সভাপতি ও সেক্রেটারি কার্যকরি পরিষদ মনোনীত করবেন।

৪|| এ সংস্থার কিছু বিভাগীয় সেক্রেটারি থাকবে যেমন
            ১.ছাত্র কল্যান বিভাগীয়
             ২. সমাজ কল্যান বিভাগীয়
             ৩. কোষাধ্যক্ষ
            ৪.ক্রিড়া সম্পাদক
            ৫. সাংস্কৃতি সম্পাদক
এসব বিভাগের একজন করে সহকরী ও থাকতে পারে।

♦আয়ের উৎস :::
==============

১.সদস্যদের দান
২.যাকাত
৩.ভিবিন্ন উদ্যোগ উপলক্ষে বিশেষ কালেকশন।

♣ এই সংস্থার নিজস্ব একটি কল্যান ফান্ড থাকবে। যার হিসাব সভাপতি, সেক্রেটারী ও কোষাধ্যক্ষ সাহেব প্রতিমাসের শেষে হিসেব করে সংক্ষিপ্ত আয় ব্যায়ের হিসাব কার্যকরি পরিষদ ও উপদেষ্টা পরিষদে পেশ করবেন।
♣কোষাধ্যক্ষ সংস্থার সকল আর্থিক হিসাব নিকাশ সুচারুভাবে দেখাশুনা ও নির্দিষ্ট বইয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখবেন।
♣ সকল প্রকার আয় কোষাধ্যক্ষের হিসাবে প্রথমে যোগ হবে।

♦ ব্যায়ের খাত :
===========

সংস্থার সংবিধান নির্ধারিত খাত ও কার্যকরি পরিষদ কর্তৃক অুমোধিত খাতেই কেবল সংস্থার অর্থ ব্যয় হবে।
ব্যায়ের ক্ষেত্রে কার্যকরি পরিষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলে গন্য হবে।
১. দরিদ্র মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদের পড়াশোনার ব্যায়বার বহন
২.আর্থি অসচ্ছল ও দুস্ত ব্যক্তি ও পরিবারকে সাবলম্বি করার চেষ্টা
৩. কন্যা দায়গ্রস্ত পরিবারকে অার্থিক সহযোগীতা
৪.প্রতিবন্ধীদের সহায়তা
৫.অসহায় পরিবারকে বিভিন্ন মৌসুমে সহায়তা প্রদান ( শীতবস্ত্র, ইফতার, ঈদ উপহার, ইত্যাদি)
৬.বিধবা ও এতিমদের সাধ্যমত সহযোগীতা করার চেষ্টা করা হবে

♣♣ তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সহযোগীতার পরিবর্তে বড় ধরনের সহযোগীতা করে দারিদ্র দূরীকরনই প্রধান লক্ষ্য থাকবে)

♥♥♥♥শৃঙ্খলা ♠♠♠
===================
১ : যেহেতু এটি একটি সমাজ কল্যানমূলক অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাই যে কেউ এর সদস্য হতে পারবে কিংবা এর সদস্য পদ হতে অব্যাহতি চাইতে বা নিতে পারবেন।

২. কার্যকরি পরিষদ বা উপদেষ্টা পরিষদ বা ব্যক্তিগতভাবে এই দুই পরিষদের কেও এই সংস্থার আর্থিক কোন কেলেংকারির সাথে জড়িত থাকা প্রমানীত হলে তিনি এই সংস্থার দায়িত্বসহ সদস্য পদও হারবেন।

♦♦♦♦♦♦♦বিশেষ দ্রষ্টব্য ♦♦♦♦♦
এটি একটি সুপরিবর্তনীয় সংবিধান। সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে এর যেকোন ধারা বা উপধারা বা যে কোন অংশ পরিবর্তন ও সংশোধন করা যাবে।

♦প্রথম কার্যকরি পরিষদ ২০১৬ _২০১৭

সভাপতি : নুর আলম মামুন
সহ সভাপতি :গোলাম মাওলা
সেক্রেটারি :আবুল কাসেম হেলাল
সহসেক্রেটারী :আমির হোসেন সাইফুল
কোষাধ্যক্ষ :আবদুর রহমান রানা
সহ :আব্দুল করিম
ছাত্রকল্যাণ বিভাগীয় প্রধান : আতিকুর রহমান.
সহ:নেজাম উদ্দিন
সহ : ভাবলু
সহ : সজিব
সমাজকল্যাণ:
সাইফুল ইসলাম ( মৌলভী বাড়ি)
সহ : মাসুদ রানা
সহ : বোরহান.
আই এচ রিয়াদ
সংস্কৃতিক সম্পাদক : মহি উদ্দিন. সহ.আবদুল মান্নান সেলিম.
সহ.আবু নাছের.
ক্রীড়া বিভাগ:
মাহফুজ আলম স্বপন
আল আমিন
সাবিদ খান জামাল

♦প্রথম উপদেষ্টা পরিষদ ২০১৬-২০১৭

১.কাজী হানিফ আনসারী ভাই.
২.মাহবুবুর রহমান জিয়া. ভাই
৩.নাজমুল ভাই ( ডাঃ মোয়াজ্জেম এর বাগীনা.)
৪.আবদুল মজিদ ভাই
৫.শামসুদ্দিন ভাই
৬.মিজানুর রহমান ভাই
৭.মাওলানা ইউসুফ ভাই
৮.ফাহিম ভাই
৯.জাকের ভাই
১০.শহীদুল ইসলাম জসিম ভাই
১১.তৌহিদ ভাই
১২.আবদুল হক ভাই.
১৩.শহীদুল ইসলাম শহীদ ভাই

পরিশিষ্ট
                 লেখক : জাকির হোসেন
                  ০১৮১৫১৮০১৬৩